অ্যাঙ্কলের চোটের কারণে টুর্নামেন্টে তার অংশগ্রহণ নিয়েই ছিল অনিশ্চয়তা। সেই এলেনা রিবাকিনা সব শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে কোর্টে নেমে ছুটতে থাকলেন অপ্রতিরোধ্য গতিতে। ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থানে জায়গা করে নেওয়াও নিশ্চিত করলেন তিনি।
তবে আসল কাজটি তখনও বাকি ছিল, আর সেখানেও কোনো খামতি রাখলেন না রিবাকিনা। ফাইনালে এরিনা সাবালেঙ্কাকে হারিয়ে নিজের স্বপ্নের ইউএস ওপেন অভিযানকে পূর্ণতা দিলেন কাজাখস্তানের এই তারকা। ইউএস ওপেনের নারী এককের ফাইনালে ৬-৪, ৫-৭, ৬-২ গেমে জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন রিবাকিনা। গ্র্যান্ড স্ল্যামে এটি তার তৃতীয় শিরোপা, চলতি বছরে দ্বিতীয় এবং ইউএস ওপেনে প্রথম।
উল্লেখ্য, ফাইনালে হারলেও আসর শেষে র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ওঠা আগে থেকেই নিশ্চিত ছিল ২৭ বছর বয়সী এই তারকার জন্য। রিবাকিনার হাতে চ্যাম্পিয়নের ট্রফি তুলে দেন পাঁচবারের গ্র্যান্ড স্ল্যামজয়ী ও এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় রুশ তারকা মারিয়া শারাপোভা।
র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর এবং টুর্নামেন্টের ফেভারিট হিসেবে অভিযান শুরু করা সাবালেঙ্কার অবশ্য শেষটা হলো হতাশায় মোড়া। ইউএস ওপেনে টানা তিন আসরে শিরোপা জিতে ক্রিস এভার্ট ও সেরেনা উইলিয়ামসের কীর্তি স্পর্শ করার হাতছানি ছিল তার সামনে, তবে এখানেই থেমে গেল তার ২০ ম্যাচের অপরাজেয় যাত্রা।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনেও সাবালেঙ্কাকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিলেন রিবাকিনা। এই শতাব্দীতে দুটি হার্ড কোর্ট গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ী তৃতীয় নারী খেলোয়াড় তিনি। সাবালেঙ্কা নিজেও একই কীর্তি গড়েছিলেন ২০২৪ সালে, আর ২০১৬ সালে এই ‘ডাবল’ জিতেছিলেন জার্মানির আঞ্জেলিক কেরবার। শিরোপা জিতে ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার প্রাইজমানি অর্জন করেছেন রিবাকিনা। রানার্সআপ সাবালেঙ্কার প্রাপ্তি ২৮ লাখ ডলার।
আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামে র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দুই খেলোয়াড়ের এই শিরোপা নির্ধারণী লড়াইয়ে ধ্রুপদি এক ম্যাচের সম্ভাব্য সব উপকরণই ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ততটা রোমাঞ্চ জমে ওঠেনি ম্যাচে। সাবালেঙ্কার খেলায় ছিল অনেক ওঠানামা, কখনো ছিলেন আক্রমণাত্মক ও ক্ষুরধার, আবার কখনো বিবর্ণ। বিপরীতে রিবাকিনার খেলায় ছিল স্পষ্ট ধারাবাহিকতা, পুরো ম্যাচজুড়েই ছিলেন অবিচল।
হলুদ-কালো পোশাকে কোর্টে নামা রিবাকিনাকে দেখাচ্ছিল যেন লক্ষ্যে স্থির কোনো শান্ত মৌমাছির মতো। পুরো ম্যাচজুড়েই তিনি ছিলেন ধীরস্থির, চাপের মধ্যেও খেই হারাননি এতটুকু। তার হাত থেকে বের হয় বেশ কয়েকটি তীক্ষ্ণ গ্রাউন্ডস্ট্রোক।
যদিও শুরুতে সাবালেঙ্কার শক্তিশালী সার্ভ তাকে কিছুটা নাড়িয়ে দিয়েছিল, তবে সাবালেঙ্কার একটি ডাবল ফল্টের পর রিবাকিনা প্রথম পয়েন্ট অর্জন করে ধীরে ধীরে ৩-২ গেমে এগিয়ে যান। হতাশ সাবালেঙ্কা এক পর্যায়ে মূল শো-কোর্টের স্ট্যান্ডের দিকে উঁচুতে বল মারার জন্য কোড ভায়োলেশনেরও শিকার হন। প্রতিটি মিস করা শট ও নষ্ট হওয়া সুযোগে সাবালেঙ্কার বিরক্তি ও হতাশা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল তার শরীরী ভাষায়। রিবাকিনা ছিলেন ঠিক তার বিপরীত, তার চেহারায় ছিল দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ছাপ। নিয়ন্ত্রণ শক্ত হাতে ধরে রেখে প্রথম সেট জিতে নেন তিনি। রাশিয়ায় জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা এই তারকা অবশ্য দ্বিতীয় সেটের মাঝামাঝি সময়ে কিছুটা নিজেকে হারিয়ে ফেলেন।
এই সুযোগেই ঘুরে দাঁড়ান সাবালেঙ্কা, একটি সূক্ষ্ম ড্রপ শট ও দুর্দান্ত এক ব্যাকহ্যান্ড ক্রসকোর্ট উইনারের মাধ্যমে খেলাটিকে নিয়ে যান তৃতীয় সেটে। ভাগ্য নির্ধারণী তৃতীয় সেটে আরেকটি ব্যাকহ্যান্ড উইনার দিয়ে নিজের সার্ভ ধরে রাখার পর গর্জে ওঠেন সাবালেঙ্কা। তবে এতে একটুও বিচলিত না হয়ে নিজের খেলা ধরে রাখেন রিবাকিনা, আর ক্রমেই বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে যান তিনি। সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেই নিশ্চিত করেন এই ঐতিহাসিক জয়।
পুরো ম্যাচজুড়ে যেমন দেখা গেছে, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরও রিবাকিনাকে দেখা গেল একই রূপে। দুর্দান্ত এক সার্ভে ম্যাচ শেষ করার পরও তার মধ্যে দেখা যায়নি উচ্ছ্বাসের কোনো বাড়াবাড়ি—একেবারে সাদামাটা এক উদযাপন, যেন কিছুই ঘটেনি। তবে তার অন্তরে যে আনন্দের জোয়ার বইছিল, তা স্পষ্ট ফুটে উঠল ২৭ বছর বয়সী এই তারকার প্রতিক্রিয়ায়। নিজের প্রত্যাশাকেও তিনি ছাপিয়ে গেছেন বলে জানান রিবাকিনা।
তিনি বলেন, সত্যি বলতে এই মুহূর্তে ভাষা খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে যাচ্ছে তার জন্য—টুর্নামেন্টে আসার আগে এমন কিছুর আশা তিনি করেননি। চোট নিয়ে কিছুটা ভুগছিলেন, তবে কোনোভাবে সবকিছুই তার অনুকূলে চলে এসেছে। সাবালেঙ্কার উদ্দেশে তিনি বলেন, তার বিপক্ষে খেলাটা সবসময়ই খুব কঠিন, কারণ সাবালেঙ্কা তাকে নিজের সামর্থ্যের শেষ বিন্দুতে ঠেলে দেন।
এমন একটি চমৎকার আবহের জন্য দর্শকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন রিবাকিনা। তার ভাষায়, দিন দিন তিনি আরও বেশি করে নিউইয়র্কের প্রেমে পড়ে যাচ্ছেন। উল্লেখ্য, চলতি বছরের এই দুই শিরোপার আগে রিবাকিনার একমাত্র গ্র্যান্ড স্ল্যাম সাফল্য ছিল ২০২০ সালের উইম্বলডন।
এবার শিরোপা ও র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান—এই জোড়া অর্জনে দারুণ রোমাঞ্চিত তিনি। তিনি বলেন, পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন অনুভব করবেন যে তিনি ইউএস ওপেন জিতেছেন এবং বিশ্বের এক নম্বর র্যাঙ্কিংও অর্জন করেছেন, তখন সেই অনুভূতিটা হবে একেবারেই অন্যরকম। তিনি আরও যোগ করেন, শেষটা এমন হওয়া তার জন্য বড় স্বস্তির ব্যাপারও—গত দুই-তিন সপ্তাহ ধরে সম্পূর্ণ রুটিনমাফিক কাজ করে যেতে হয়েছে তাকে, অনেক পরিশ্রমের পাশাপাশি সহ্য করতে হয়েছে প্রচণ্ড স্নায়ুচাপও।
শিরোপা জিতেও রিবাকিনা যেখানে ছিলেন শান্ত ও প্রায় নির্বিকারভাবে বেঞ্চে নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিলেন, ম্যাচ হেরে সাবালেঙ্কার চিত্র ছিল ঠিক তার উল্টো। ম্যাচ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নিজের র্যাকেট ছুড়ে ফেলেন তিনি। পরে কোর্টের পাশে নিজের আসনে গিয়ে মাটিতে বারবার আছড়ে ভেঙে ফেলেন র্যাকেটটি।
পরবর্তীতে অশ্রুসিক্ত চোখে অকপটে স্বীকারও করেন সাবালেঙ্কা, নিজের আবেগ তিনি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে তিনি কোনো বক্তব্যই দিতে চাইছিলেন না, তারপরও সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। তার ভাষায়, গ্র্যান্ড স্ল্যামের ফাইনালে হেরে যাওয়া এবং ‘থ্রি-পিট’ জয়ের চেষ্টার মধ্যে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা সত্যিই কঠিন, তাই তিনি এই আবেগকে পাশ কাটাতে চেয়েছিলেন—কারণ আবেগটা ভেতরে চেপে রাখলে হয়তো একটি কথাও বলতে পারতেন না তিনি।
তিনি স্বীকার করেন যে তিনি হতাশ, তবে এলেনাকে অভিনন্দন জানাতে চান তিনি। নিজে যদি আরেকটু ভালো খেলতে পারতেন, তাহলে হয়তো ফলাফল ভিন্ন হতো বলেও মনে করেন তিনি। শেষে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী বছরই হয়তো আবার এমন একটি সুযোগ আসবে তার সামনে। উল্লেখ্য, চারটি গ্র্যান্ড স্ল্যামজয়ী বেলারুশের এই তারকার এই বছরটা শেষ হলো কোনো বড় শিরোপা ছাড়াই।
ডিসি/আপ্র/১৩/৯/২০২৬