মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, মহম্মদপুর (মাগুরা): মাগুরার মহম্মদপুরে মধুমতি নদী যেন ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে উঠছে। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে তীব্র হয়েছে নদীভাঙন। প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা ও বিভিন্ন স্থাপনা। সর্বস্ব হারানোর শঙ্কায় নদীতীরবর্তী প্রায় ২০ গ্রামের শত শত পরিবার। কারো ঘর একাধিকবার সরাতে হয়েছে, কেউ হারিয়েছেন আবাদি জমি, আবার কেউ অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে কোনোমতে দিন কাটাচ্ছেন। ভাঙনের আতঙ্কে অনেক পরিবারের রাত কাটছে নির্ঘুম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতির পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে মধুমতির তলদেশ ও গতিপথের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে নদীতীরে। বর্ষা ও পানি বৃদ্ধির সময় সেই ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আরো বসতভিটা, কৃষিজমি ও স্থাপনা নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
সাম্প্রতিক সময়ে উপজেলার উত্তরে চরসেলামতপুর থেকে দক্ষিণে কালিশংকরপুর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গোপালনগর, মহেষপুর, হরেকৃষ্ণপুর, ঝামা, চরঝামা, আড়মাঝি, যশোবন্তপুর, চরপাচুড়িয়া, রায়পুর, মুরাইল, ধুপুড়িয়া, জাঙ্গালিয়া, রুইজানি, কাশিপুর, ধুলজুড়ি, দ্বিগমাঝি, দেউলি, ভোলানাথপুর ও কালিশংকরপুরসহ প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষ ভাঙনের আতঙ্কে রয়েছেন। এসব এলাকার মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, ঈদগাহ, মন্দির, দোকানপাট ও বাজারও ঝুঁকিতে রয়েছে।
ভাঙনের ভয়াবহতা বোঝা যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দুর্দশা থেকে। হরেকৃষ্ণপুর গ্রামের তহিদুল ইসলাম লিপন ও তার স্ত্রী নাসরিন সুলতানা জানান, ইতোমধ্যে তাদের ১০ থেকে ১২ একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পাঁচবার বাড়ি সরাতে হয়েছে তাদের। এবারও ভাঙনের আশঙ্কায় পাশের জমিতে সাময়িকভাবে ঘর তুলে বসবাস করছেন তারা। আবার কখন ঘর সরাতে হবে, কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেবেন-এই দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
একই গ্রামের স্বামীহারা নুর নাহার চারবার বাড়ি সরিয়েছেন। ভাঙনে ফসলি জমি ও গাছপালা হারিয়ে এখন দিশেহারা তিনি। ভ্যানচালক মো. ইনামুল শেখের বাড়ির ভিটা তিনবার নদীগর্ভে গেছে। নিজের কোনো জমি না থাকায় বর্তমানে অন্যের বাড়িতে ভাড়া থাকছেন তিনি। ভ্যান চালিয়ে কষ্টে সংসার চালানো এই মানুষটির সামনেও আবারো ঘর হারানোর শঙ্কা।
নদীভাঙনের এই পরিস্থিতি নতুন নয়। প্রতি বর্ষা মৌসুমেই মধুমতির ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করতে হয় নদীপাড়ের মানুষকে। গত কয়েক বছর ধরে ভাঙনে বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে অনেক পরিবার ভূমিহীন হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এবারও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কার্যকর না হলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা আরো বাড়বে।
ভাঙনের পেছনে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগও নতুন নয়। চলতি বছরের ১৬ জুন মহম্মদপুরের শিরগ্রাম এলাকার করিমের ঘাটে মধুমতি নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে খন্দকার মামুন অর রশিদ নামে এক ব্যক্তিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। প্রশাসন জানিয়েছিল, ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের সময় তাকে আটক করা হয় এবং বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী জরিমানা করা হয়।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে কি নদীভাঙনের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট ঠেকানো সম্ভব? তাদের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর নজরদারি না থাকলে বর্ষা মৌসুমে তার মাশুল দিতে হয় নদীপাড়ের মানুষকে। তাই অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও কার্যকর অভিযান এবং নদীর গতিপথ ও তীর রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ভাঙনের খবর পেয়ে গত ১৯ আগস্ট মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেদবতী মিস্ত্রী হরেকৃষ্ণপুরসহ ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি প্রায় ৩০০ মিটার জিওব্যাগ ডাম্পিং এলাকা ঘুরে দেখেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। স্থানীয়দের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে টেকসই পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
মাগুরা জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সন্তোষ কর্মকারও জানিয়েছেন, নদীভাঙনে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত জিওব্যাগ ফেলার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
এর আগে মহম্মদপুরের ভাঙনকবলিত এলাকায় ৩০০ মিটার জিওব্যাগ ফেলার প্রস্তাবের কথাও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। কাশিপুর এলাকায় দুটি অংশে জিওব্যাগ ফেলার পরিকল্পনা ছিল, যার প্রতিটি অংশে ছয় হাজার ৫০০ বস্তা করে জিওব্যাগ ব্যবহারের কথা বলা হয়। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দাবি, সাময়িক প্রতিরোধ ব্যবস্থা দিয়ে প্রতিবছরের ভাঙন ঠেকানো যাবে না। তাদের প্রয়োজন স্থায়ী নদীশাসন ও তীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা। কারণ একটি পরিবার একবার ঘর হারালে শুধু একটি স্থাপনা হারায় না-হারায় বসতভিটা, কৃষিজমি, গাছপালা, জীবিকার ভিত্তি এবং বহু বছরের সামাজিক ঠিকানা।
নদীতীরের মানুষের এখন একটাই প্রশ্ন-আর কত ঘর নদীতে গেলে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? ভুক্তভোগীদের দাবি, মধুমতির ভাঙনকে শুধু বর্ষাকালীন দুর্যোগ হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে নিতে হবে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং স্থায়ী নদীশাসন-এই তিনটি উদ্যোগ একসঙ্গে নেওয়া না হলে প্রতিবছরই নতুন করে ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকবে।
মধুমতির ভাঙনে তাই এখন শুধু কয়েকটি পরিবারের বসতভিটা রক্ষার প্রশ্ন নয়; ঝুঁকিতে রয়েছে বিস্তীর্ণ জনপদ, কৃষিজমি ও স্থানীয় অবকাঠামো। দ্রুত সমন্বিত ও টেকসই উদ্যোগ না এলে নদীর স্রোতে হারিয়ে যেতে পারে আরো বহু মানুষের শেষ আশ্রয়টুকুও।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/১৩/৯/২০২৬