২৫ বছর আগে ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে নয়, বদলে দিয়েছিল গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা-ভাবনা। নিউ ইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্যকেন্দ্র, ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর ও পেনসিলভানিয়ায় বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় তিন হাজার মানুষ। সেই হামলার জবাব দিতে শুরু হয়েছিল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। কিন্তু এক-চতুর্থাংশ শতাব্দী পর দাঁড়িয়ে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হলো-নিরাপত্তা কি সত্যিই বেড়েছে, নাকি যুদ্ধের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সন্ত্রাসের রূপও আরো জটিল হয়েছে?
আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান আল-কায়েদাকে বড় আঘাত করেছিল। ওসামা বিন লাদেন ও আয়মান আল-জাওয়াহিরির পতন ছিল সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। কিন্তু দুই দশকের যুদ্ধের পর তালেবানের পুনরুত্থান দেখিয়েছে, সামরিক শক্তি দিয়ে কোনো দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা স্থায়ীভাবে বদলে দেওয়া যায় না। একটি সন্ত্রাসী সংগঠনকে দুর্বল করা এবং একটি কার্যকর, স্থিতিশীল রাষ্ট্র গড়ে তোলা এক বিষয় নয়। এই মৌলিক পার্থক্য উপেক্ষা করাই ছিল ৯/১১-পরবর্তী যুদ্ধনীতির বড় দুর্বলতা।
ইরাকের অভিজ্ঞতা আরো নির্মম। গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অভিযোগকে সামনে রেখে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, অথচ পরে সেই অস্ত্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তার ওপর রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরো বিপজ্জনক করে তোলে। সেনাবাহিনী বিলুপ্তি, প্রশাসনিক কাঠামোর বিপর্যয় এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজন এমন এক শূন্যতা তৈরি করে, যেখানে জঙ্গিবাদ শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ পায়। পরে ইসলামিক স্টেটের উত্থান প্রমাণ করে, রাষ্ট্রকে দুর্বল করে সন্ত্রাস নির্মূল করা যায় না; বরং রাষ্ট্রীয় শূন্যতা নতুন সন্ত্রাসের জন্ম দিতে পারে।
এই যুদ্ধের মূল্যও কম নয়। ৯/১১-পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি এবং প্রত্যক্ষ সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ৯ লাখেরও বেশি বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন কোটি কোটি মানুষ। সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্য হলো, এই বিপুল মানবিক মূল্য বহন করেছে এমন জনগোষ্ঠী, যাদের অধিকাংশই ৯/১১-এর জন্য দায়ী ছিল না। নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার নামে যদি সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বড় মূল্য দেয়, তবে সেই নিরাপত্তার নৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
অবশ্যই সন্ত্রাস দমনে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন। গোয়েন্দা সহযোগিতা, সীমান্তনিরাপত্তা, আর্থিক নজরদারি ও লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান বহু সম্ভাব্য হামলা প্রতিহত করেছে। কিন্তু নিরাপত্তার নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমাহীন বিস্তারও গ্রহণযোগ্য নয়। নাগরিক স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও আইনের শাসন দুর্বল করে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।
২৫ বছরের অভিজ্ঞতা তাই নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি কঠিন সত্য হাজির করেছে-সন্ত্রাসকে শুধু সামরিক সমস্যা হিসেবে দেখলে সমাধান অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। সন্ত্রাসের বিস্তারের পেছনে দুর্বল রাষ্ট্র, রাজনৈতিক বঞ্চনা, সাম্প্রদায়িক বিভাজন, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সামাজিক হতাশার ভূমিকা অস্বীকার করা যাবে না। যেখানে রাষ্ট্র মানুষের আস্থা হারায়, সেখানে সন্ত্রাসী সংগঠন শূন্যস্থান দখলের সুযোগ পায়।
এখন আর পুরোনো যুদ্ধনীতির সাফল্যের গল্প শোনানোর সময় নয়; সময় তার ব্যর্থতা থেকে বাধ্যতামূলক শিক্ষা নেওয়ার। ভবিষ্যতে কোনো সামরিক অভিযান শুরু করার আগে তার রাজনৈতিক লক্ষ্য, আন্তর্জাতিক বৈধতা, মানবিক মূল্য এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনা স্পষ্ট করতে হবে। বেসামরিক মানুষের জীবনকে সামরিক বিজয়ের বলি করা যাবে না, আর সন্ত্রাস দমনের নামে নাগরিক অধিকারও বিসর্জন দেওয়া যাবে না। রাষ্ট্রগুলোকে একই সঙ্গে গোয়েন্দা সহযোগিতা, লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান, আইনের শাসন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সুশাসন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ওপর বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, যুদ্ধকে আর সহজ সমাধান হিসেবে দেখার বিপজ্জনক প্রবণতা পরিত্যাগ করতে হবে। যে যুদ্ধের শেষ কোথায়, তার রাজনৈতিক সমাধান কী এবং যুদ্ধের পর রাষ্ট্র ও মানুষের ভবিষ্যৎ কী হবে-তার স্পষ্ট উত্তর নেই, সে যুদ্ধ শুরু করার নৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার কোনো রাষ্ট্রের থাকা উচিত নয়। ৯/১১-এর ২৫ বছর পর বিশ্বকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে: প্রতিটি নতুন সন্ত্রাসের জবাব আরেকটি যুদ্ধ দিয়ে নয়, সন্ত্রাসের জন্মের কারণ নির্মূলের রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার দিয়ে দিতে হবে। কারণ নিরাপত্তার নামে অনন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কোনো বিজয় নয়; প্রকৃত বিজয় হলো এমন পৃথিবী নির্মাণ করা, যেখানে যুদ্ধের প্রয়োজনই ক্রমে কমে আসে এবং সন্ত্রাসের জন্য নতুন প্রজন্মকে আর হারাতে না হয়।
সানা/আপ্র/১২/৯/২০২৬