পৃথিবীর সব দেশ ঘুরে দেখা—শুনতে যতটা রোমাঞ্চকর, বাস্তবে তা অর্জন করা ততটাই কঠিন। দীর্ঘ পরিকল্পনা, অর্থ, ভিসা, সময় এবং অচেনা পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন এমন একটি যাত্রায়। বাহরাইনের রাশা ইউসিফ সেই কঠিন পথই বেছে নিয়েছেন। ভ্রমণের সঙ্গে ফটোগ্রাফিকে সঙ্গী করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন তিনি।
রাশার বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৫টি দেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তবে তার ভ্রমণকাহিনির বিশেষত্ব শুধু দেশসংখ্যায় নয়। এই দীর্ঘযাত্রার আরেকটি দৃশ্যমান পরিচয়—হিজাব। রাশার কাছে হিজাব কেবল পোশাক নয়; এটি তার পরিচয়, মূল্যবোধ এবং পৃথিবীর সামনে নিজেকে উপস্থাপনের একটি অংশ। বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে যেতে যেতে হিজাবকে তিনি দেখেছেন নানা রূপে।
নিজের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে রাশা লিখেছেন, ‘আমার হিজাব নিয়ে কীভাবে আমি পৃথিবীর পথে চলি, নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করি এবং আমি কীসের পক্ষে দাঁড়াই—এসবকেই প্রভাবিত করে। ১৯৫টি দেশ ভ্রমণ করে আমি আরও দেখেছি, বিভিন্ন সংস্কৃতিতে নারীরা কত ভিন্নভাবে হিজাব পরেন। সংস্কৃতিভেদে এর ধরন বদলাতে পারে, কিন্তু যে বিষয়টি অপরিবর্তিত থাকে, তা হলো—হিজাব পরা নারীটি নিজেই।’
বিশ্বের নানা প্রান্তে ভ্রমণ করতে গিয়ে নারীদের শক্তির যে চিত্র তিনি দেখেছেন, সেটিও তার কাছে বিশেষ অর্থ বহন করে। রাশা বলেন, ‘আমি এমন নারীদের দেখেছি, যারা প্রচণ্ড রোদের মধ্যে হিজাব পরে কাজ করছেন, সন্তান বহন করছেন এবং এমন শারীরিক পরিশ্রম করছেন, যা অধিকাংশ মানুষকেই ক্লান্ত করে ফেলবে। হিজাব থাকুক বা না থাকুক, নারীরা শক্তিশালী। আর আমি যতদূরই ভ্রমণ করেছি, কোথাও এর বিপরীত কোনো প্রমাণ পাইনি।’
রাশার বক্তব্যে হিজাব কোনো সীমাবদ্ধতার প্রতীক নয়। বরং এটি তার যাত্রার সঙ্গে থাকা একটি পরিচয়। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে যেতে তিনি দেখেছেন, পোশাকের ধরন বদলায়, সংস্কৃতি বদলায়, মানুষের জীবনযাপন বদলায়; কিন্তু নারীর শক্তি ও সক্ষমতা কোনো নির্দিষ্ট পোশাকের ওপর নির্ভর করে না।
ক্যামেরা থেকে বিশ্বভ্রমণ
রাশার ভ্রমণের গল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ফটোগ্রাফি। একটি আন্তর্জাতিক যুব বিনিময় কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, শিকাগো ও ওয়াশিংটন ডিসি ভ্রমণের সময় তার হাতে আসে প্রথম ক্যামেরা। সেই ক্যামেরাই পরে পৃথিবী দেখার অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠে তার।
২০১৬ সালে বাহরাইনের আল ওয়াসাতকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাশা জানিয়েছিলেন, বিভিন্ন ফটোগ্রাফি কর্মশালা ও প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে ভ্রমণের প্রতি তার আগ্রহ বাড়তে থাকে। তখন তিনি বুঝতে শুরু করেন, পৃথিবীকে শুধু পর্যটকের চোখে নয়, একজন ফটোগ্রাফারের চোখেও দেখা যায়। এরপর ধীরে ধীরে এক দেশের পর আরেক দেশ। নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি, নতুন গল্প—সবকিছুই জায়গা করে নেয় তার ক্যামেরায়।
২০২৪ সালের অক্টোবরে বাহরাইনের বিজ বাহরাইন তাকে বিশ্বের সব দেশ ভ্রমণকারী প্রথম বাহরাইনি হিসেবে উল্লেখ করে। প্রতিবেদনে তার ১২ বছরের ভ্রমণযাত্রার কথা বলা হয়। তবে এই দীর্ঘযাত্রার শেষ পর্যায়ও সহজ ছিল না। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মুখে তাকে নিজের অনলাইন সম্প্রদায়ের সহায়তা নিতে হয়েছিল। নিজের তোলা ছবির প্রিন্ট বিক্রি করেও ভ্রমণের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন তিনি।
অর্থাৎ রাশার বিশ্বভ্রমণ শুধু বিমানের টিকিট, হোটেল আর পাসপোর্টের গল্প নয়। এর সঙ্গে ছিল দীর্ঘ পরিকল্পনা, সংগ্রাম, অর্থসংকট এবং নিজের স্বপ্নের প্রতি অটুট বিশ্বাস।
পৃথিবী দেখার সঙ্গে মানুষকেও দেখা
রাশার কাছে ভ্রমণ মানে শুধু নতুন একটি দেশের বিখ্যাত স্থাপনা দেখা নয়। একজন ফটোগ্রাফার হিসেবে মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে দেখার চেষ্টা করেছেন তিনি। বিভিন্ন দেশে গিয়ে মানুষের সঙ্গে তার কথোপকথনও হয়েছে।
বিশেষ করে হিজাব নিয়ে মানুষের কৌতূহল অনেক সময় তাকে নিজের সংস্কৃতি ও পরিচয় নিয়ে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে। এই জায়গাটিই তার ভ্রমণকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। তিনি পৃথিবী ঘুরেছেন, একই সঙ্গে দেখেছেন পৃথিবীর মানুষকেও।
সংখ্যার চেয়ে বড় যে গল্প
রাশা ইউসিফের ভ্রমণসংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তার নিজের ২০২৬ সালের একটি লেখায় ১৯৫টি দেশের কথা উল্লেখ আছে। আবার পরবর্তী একটি সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বেশি সংখ্যার কথা বলেছেন। ফলে তার বর্তমান মোট দেশসংখ্যা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে সরাসরি তার কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
তবে সংখ্যার এই পার্থক্য তার মূল কৃতিত্বকে ছোট করে না। ১৯৫টি দেশ হোক কিংবা পরে উল্লেখ করা আরও বড় সংখ্যা—এর পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর ভ্রমণ, অসংখ্য সীমান্ত অতিক্রম, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে পরিচয় এবং নিজের পরিচয়কে সঙ্গে নিয়ে পৃথিবীকে দেখার সাহস।
রাশার গল্প তাই শুধু একজন ভ্রমণকারীর গল্প নয়। এটি একজন নারীর নিজের পরিচয়কে সঙ্গে নিয়ে পৃথিবীকে আবিষ্কার করার গল্প। এমন এক যাত্রা, যেখানে হিজাব তার কাছে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি; বরং পরিচয়ের অংশ হিসেবেই পথ চলার সঙ্গী হয়েছে।
পৃথিবী যত বড়ই হোক, স্বপ্ন যদি তার চেয়েও বড় হয়—তাহলে পথ খুঁজে নেওয়া সম্ভব।
এসি/আপ্র/১২/০৯/২০২৬