সরকারি হাসপাতাল মানুষের শেষ ভরসা। বিশেষ করে ডেঙ্গুর মতো রোগের প্রাদুর্ভাবের সময়ে অসুস্থ মানুষ যখন সরকারি হাসপাতালে ছুটে যান, তখন সেখানে চিকিৎসার পাশাপাশি নিরাপদ, স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য সেবা পাওয়াও তাঁদের অধিকার। অথচ মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের রক্ত সংগ্রহ করে বাইরে পরীক্ষা করানোর যে ঘটনা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনে সামনে এসেছে, তা সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ। এটি শুধু একটি হাসপাতালের বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়; বরং নজরদারি, প্রশাসনিক দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহির দুর্বলতারও স্পষ্ট ইঙ্গিত।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ১৫ থেকে ২০ জন ডেঙ্গু রোগীর কাগজপত্র পরীক্ষা করে দেখেছেন, তাঁদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাইরে থেকে করানো হয়েছে। হাসপাতালের ভেতরে দিনের বেলায় বাইরের লোকজন এসে রোগীদের রক্ত সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, হাসপাতালের ভেতরে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের কাছে বাইরের লোকজনের এমন অবাধ প্রবেশের সুযোগ হলো কীভাবে? কার অনুমতিতে রক্ত সংগ্রহ করা হচ্ছিল? হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা জানতো না, নাকি জেনেও নীরব ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া অনিয়ম বন্ধের কোনো উদ্যোগই পূর্ণতা পাবে না।
সমস্যার সবচেয়ে বড় দিক এখানেই-অনিয়ম অনেক সময় ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু তার পেছনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা অক্ষত থেকে যায়। হাসপাতালের ভেতরে বাইরের প্রতিষ্ঠানের লোকজন রোগীর কাছে পৌঁছাতে পারলে সেখানে অনুমতি, তদারকি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ঘাটতি অবশ্যই রয়েছে। আবার রোগী যদি সরকারি হাসপাতালে এসেও পরীক্ষা করাতে বাইরে যেতে বাধ্য হন, তবে সরকারি ব্যবস্থার সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এই সুযোগে রোগীর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে বাণিজ্যিক স্বার্থ সক্রিয় হলে স্বাস্থ্যসেবা তার মানবিক চরিত্র হারায়।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় ডেঙ্গু রোগীদের মশারি ব্যবহারে অবহেলা। আক্রান্ত রোগীকে মশারির বাইরে রাখা শুধু তাঁর নিজের ঝুঁকি বাড়ায় না, রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি করে। ফলে নির্দেশ জারি করাই যথেষ্ট নয়; প্রতিটি রোগীর শয্যায় মশারি ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং এর জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মশা নিধন ও লার্ভা ধ্বংসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বরিশাল ও পিরোজপুরে সুপারি গাছের গোড়ায় জমে থাকা পানিতে লার্ভা সৃষ্টির বিষয়টি চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ডেঙ্গুর মতো জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়। জলাবদ্ধতা, অপরিচ্ছন্নতা ও যত্রতত্র লার্ভা সৃষ্টির উৎস চিহ্নিত করে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত, নিয়মিত ও ফলাফলভিত্তিক তদারকি প্রয়োজন।
এখন প্রশ্ন, বাধা কোথায়? বাধা মূলত জবাবদিহির দুর্বলতা, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা এবং অনিয়ম শনাক্ত হওয়ার পরও তার পরিণতি দৃশ্যমান না হওয়া। তাই মুগদা হাসপাতালের ঘটনায় দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। কারা রক্ত সংগ্রহ করেছে, কার অনুমতিতে করেছে, রোগীদের কাছ থেকে কী পরিমাণ অর্থ নেওয়া হয়েছে এবং হাসপাতালের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত ছিলেন কি না-সবকিছু খতিয়ে দেখতে হবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে পদমর্যাদা নির্বিশেষে ব্যবস্থা নিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তদন্তের ফল জনগণকে জানাতে হবে। শুধু তদন্ত কমিটি গঠন কিংবা সাময়িক হুঁশিয়ারিতে কাজ হবে না। দায় নির্ধারণ, শাস্তি, অনিয়মের পথ বন্ধ এবং ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর স্থায়ী ব্যবস্থা-চারটিই নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতালের ভেতরে অননুমোদিতভাবে বাইরের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ, রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্বচ্ছ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত আকস্মিক পরিদর্শন চালু করা যেতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবা কোনো দয়া নয়, নাগরিকের অধিকার। তাই মুগদা হাসপাতালের ঘটনা যেন কেবল এক দিনের আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থাকে। শুধু হুঁশিয়ারি নয়, অনিয়মের বিরুদ্ধে চাই দৃশ্যমান তদন্ত, দায় নির্ধারণ, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং স্থায়ী জবাবদিহি। সরকারি হাসপাতালকে রোগীর নিরাপদ আশ্রয় হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করতে হবে-অনিয়মকারীর নিরাপদ ক্ষেত্র হিসেবে নয়।
সানা/১৩/৯/২০২৬