গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

বেকারি পণ্যে ৫০ শতাংশ দাম বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক?

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ০১:৪১ পিএম, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ০২:২৫ এএম ২০২৬
বেকারি পণ্যে ৫০ শতাংশ দাম বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক?
ছবি

১২ সেপ্টেম্বর থেকে বেকারি পণ্যের দাম সমন্বয় শুরু হয়েছে -ছবি সংগৃহীত

১০ টাকার বনরুটি ১৫ টাকা। অর্থাৎ এক লাফে দাম বেড়েছে ৫০ শতাংশ। কোথাও ১৫ টাকার পণ্য ২০ টাকা, ২০ টাকার পণ্য ২৫ টাকা। অথচ বেকারি পণ্যের প্রস্তুতকারক সংগঠন সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম সমন্বয়ের কথা জানিয়েছিল। ফলে প্রশ্ন উঠেছে-উৎপাদন ব্যয় আসলে কতটা বেড়েছে, আর সেই ব্যয়ের সঙ্গে বাজারে কোনো কোনো পণ্যের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে?

১২ সেপ্টেম্বর থেকে বেকারি পণ্যের দাম সমন্বয় শুরু হয়। বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেছেন, এটি বড় কোনো মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা নয়; ব্যবসায়িক বাস্তবতায় মালিকেরা সম্মিলিতভাবে দাম কিছুটা সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ৪০ বা ৫০ টাকা দামের পণ্যে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং ১২ টাকার কেক ১৫ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ সমিতির বক্তব্যেও সব পণ্যে একই হারে ২০ শতাংশ বৃদ্ধির কথা নেই।

কিন্তু বাজারের চিত্র আরো বেশি অস্বস্তিকর। বিভিন্ন এলাকায় ১০ টাকার বনরুটি ১৫ টাকা হওয়ায় ওই পণ্যে সরাসরি ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। আবার কিছু বেকারি ও দোকানে নির্ধারিত সমন্বিত দাম পুরোপুরি অনুসরণ না করে নিজেদের মতো করে দাম নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। কোথাও আবার দাম না বাড়িয়ে পণ্যের ওজন কমানো হয়েছে। ফলে একই ধরনের বেকারি পণ্যের দাম এলাকাভেদে ভিন্ন হয়ে উঠেছে।

কাঁচামালের দাম কতটা বেড়েছে: বেকারি মালিকদের মূল যুক্তি কাঁচামাল ও জ্বালানি ব্যয়। তাদের দাবি, ময়দা, আটা, চিনি, ভোজ্যতেল ও ডালডার দাম বেড়েছে। কিন্তু এখানে তথ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের তথ্য উদ্ধৃত করে সাম্প্রতিক বাজার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এক মাসে খোলা ময়দার দাম প্রায় ৮ শতাংশ, প্যাকেট ময়দা ১০ দশমিক ৭১ শতাংশ, সাদা আটা ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ, খোলা সয়াবিন তেল ৫ দশমিক ৩ শতাংশ, পাম তেল ২ শতাংশ এবং চিনি ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। ছোলা ও মসুর ডালের দামও বেড়েছে।

অন্যদিকে বেকারি মালিকদের দেওয়া হিসাবে এক মাসে চিনি কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা এবং আটা-ময়দা কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আরেকটি হিসাবে ৫০ কেজির ময়দার বস্তা এক বছরে ২ হাজার ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ৩ হাজার ২০০ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি একেবারে অস্বীকার করার সুযোগ নেই; তবে এক মাসের সরকারি বাজারতথ্য এবং ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ বৃদ্ধির দাবির মধ্যে পার্থক্যও স্পষ্ট।

গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটেও বেড়েছে ব্যয়: বেকারি মালিকদের দাবির সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা জ্বালানি সংকট। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানাকে পাইপলাইনের গ্যাসের পরিবর্তে এলপিজি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বৈদ্যুতিক ওভেন, মিক্সারসহ যন্ত্রপাতি সচল রাখা কঠিন হচ্ছে। কোনো কোনো কারখানায় বিদ্যুৎ না থাকায় ওভেনে থাকা পণ্য নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। নারায়ণগঞ্জের একটি বেকারিতে দিনে ১২ ঘণ্টার মধ্যে ৫-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।

ঢাকার মোহাম্মদপুরের সুপরিচিত রনি বেকারির একজন অংশীদার আজকের প্রত্যাশাকে বলেন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তব ভিত্তি আছে। তাঁর যুক্তি, ‘উৎপাদন কমে গেলে কারখানার ভাড়া, শ্রমিকের বেতন, পরিবহন ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় একই সঙ্গে বহন করতে হয়। ফলে শুধু কাঁচামালের দাম দিয়ে বেকারি পণ্যের প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় হিসাব করা যাবে না।’

তবু ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রশ্ন থেকেই যায়: এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্ন করে সংশ্লিষ্ট একাধিক বেকারিমালিক ও ব্যবসায়ীর কাছ থেকে যে উত্তর পাওয়া গেল তা হলো-কোনো কাঁচামালের দাম ৫, ৮ বা ১১ শতাংশ বাড়লেই তৈরি পণ্যের দাম একই হারে বাড়বে- এমন সরল হিসাবও ঠিক নয়। কারণ কাঁচামাল ছাড়াও জ্বালানি, শ্রম, ভাড়া, পরিবহন, বিদ্যুৎ, অপচয় ও অন্যান্য ব্যয় রয়েছে। আবার এসব ব্যয়ের সবগুলোই যদি একই সময়ে বাড়ে, তাহলে উৎপাদন ব্যয় কাঁচামালের তুলনায় বেশি বাড়তে পারে।

ঢাকার কারওয়ানবাজার, ফার্মগেট ও শ্যামলী এলাকার শ্রমজীবী ও গাড়িচালক কয়েকজন নিয়মিত ক্রেতার বক্তব্য থেকে যে প্রশ্ন পাওয়া গেল তা হলো- দাম বৃদ্ধির অর্থ এই নয় যে, ১০ টাকার পণ্যের দাম ১৫ টাকা করার যৌক্তিকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। কারণ ১০ থেকে ১৫ টাকা মানে বিক্রয়মূল্যে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি। অথচ প্রস্তুতকারক সংগঠনের ঘোষিত সমন্বয় সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত। বাজারে যদি তার চেয়েও বেশি দাম নেওয়া হয়, তাহলে সেই অতিরিক্ত বৃদ্ধির পেছনে সুনির্দিষ্ট ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা জরুরি।

পাইকারি থেকে খুচরা বাজারে কোথায় বাড়ছে দাম: বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির প্রভাব যেমন রয়েছে, তেমনি সরবরাহ সংকট ও বাজারের বিভিন্ন স্তরের মূল্য নির্ধারণও ভূমিকা রাখছে। খুচরা ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, ময়দার সরবরাহে সংকট রয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে প্যাকেটজাত ময়দার দাম দ্রুত বেড়েছে। আবার সরকারি বাজারতথ্যে সাম্প্রতিক এক মাসে অধিকাংশ প্রধান কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির হার এক অঙ্কের মধ্যে বা তার কাছাকাছি। ফলে কাঁচামাল থেকে বেকারি পর্যন্ত পুরো সরবরাহশৃঙ্খলে কোথায় কত বাড়তি ব্যয় হয়েছে, তার স্বচ্ছ হিসাব ছাড়া ভোক্তার ওপর ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বাড়তি বোঝা চাপানো কতটা যৌক্তিক-সেই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।

ভোক্তার পকেটে চাপ, কমছে বিক্রিও: ভোক্তাদের অভিযোগ, আয় না বাড়লেও নিত্যপণ্যের পর এক বেকারি পণ্যের দাম বাড়ছে। শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে বনরুটি, পাউরুটি, বিস্কুট বা কেক অনেক সময় তুলনামূলক কম খরচের নাশতা। দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের দৈনন্দিন খাদ্যব্যয়ও বাড়ছে। এরই মধ্যে খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, দাম বাড়ার পর কিছু এলাকায় বিক্রিও কমেছে; আগে দুপুরের আগেই শেষ হয়ে যাওয়া কিছু পণ্য দিন শেষে অবিক্রীত থাকছে।

সব মিলিয়ে অনুসন্ধানের তথ্য বলছে, বেকারি শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে-এটি বাস্তব। কাঁচামালের দাম, গ্যাসের সংকট, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, পণ্য নষ্ট হওয়া এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এসব বাস্তব সমস্যার আড়ালে বাজারে কোনো কোনো পণ্যের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি স্বয়ংক্রিয়ভাবে যৌক্তিক হয়ে যাওয়া নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো নীরব। বিশেষ করে ১০ টাকার বনরুটি ১৫ টাকা হলে সেই অতিরিক্ত ৫০ শতাংশের ব্যাখ্যা কী- তা ক্রেতার প্রশ্নের মধ্যে ঘুরপাক খেলেও এর যৌক্তিকতা নির্ধারণের দায়িত্ব যে সরকারের মূল নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপেক্ষর, তারা এখনো নিস্ক্রিয়।

ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, এ জন্য প্রয়োজন উৎপাদন ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দামের পার্থক্য যাচাই এবং বাজার তদারকি। ব্যবসায়ীরা প্রকৃত ব্যয় বৃদ্ধির প্রমাণ দেবেন, আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাচাই করে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করবে-এটাই হওয়া উচিত স্বাভাবিক পদ্ধতি। নইলে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির বাস্তব সমস্যাকে সামনে রেখে একশ্রেণির ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ নিলে তার পুরো বোঝা গিয়ে পড়বে সেই সাধারণ মানুষের ওপর, যার সকালের নাশতার শেষ ভরসাটুকুও এখনো বনরুটি। 
সানা/আপ্র/১৬/৯/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ইলেকট্রিশিয়ান বলে রাশিয়ায় নিয়ে পাঠানো হয় যুদ্ধক্ষেত্রে
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইলেকট্রিশিয়ান বলে রাশিয়ায় নিয়ে পাঠানো হয় যুদ্ধক্ষেত্রে

পরিবার পেলো যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর খবর

১০৪ বছর বয়সে কারাগারে বৃদ্ধ
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১০৪ বছর বয়সে কারাগারে বৃদ্ধ

মৃত্যুদণ্ড কমে সাজা ১০ বছর

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতায় ঢাকা-কলকাতায় বাস্তুচ্যুতির শঙ্কা
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতায় ঢাকা-কলকাতায় বাস্তুচ্যুতির শঙ্কা

জাতিসংঘের প্রতিবেদন

কলকাতায় চিকিৎসা করাতে গিয়ে বিপাকে বাংলাদেশিরা
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কলকাতায় চিকিৎসা করাতে গিয়ে বিপাকে বাংলাদেশিরা

রাত কাটছে রাস্তায়

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই