গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

মেনু

নিবন্ধ===

গালি-ঘৃণা ছাড়ায় প্রতিবাদী ভাষার সৌন্দর্য হয়ে ওঠে সম্মিলিত গান

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:২২ পিএম, ৩১ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২২:২৯ এএম ২০২৬
গালি-ঘৃণা ছাড়ায় প্রতিবাদী ভাষার সৌন্দর্য হয়ে ওঠে সম্মিলিত গান
ছবি

ছবি সংগৃহীত

সাম্প্রতিক সামাজিক বাস্তবতায় এমন এক দৃশ্য দেখা গেছে- যা একটি ঘটনা কেন্দ্র করে মানুষের সংহতি, সাহস ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের নতুন অধ্যায় রচনা করেছে। একজন নারীকে সামাজিকভাবে অপমান করার চেষ্টা হয়েছিল। তার অপরাধ, তিনি প্রকৃতির সঙ্গে মিশে একটি গানকে সঙ্গী করে নিজের স্বাভাবিক আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু ওই ব্যক্তিগত আনন্দকে বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে তাকে আক্রমণের লক্ষ্য বানানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল- একজনকে ভয় দেখানো। কিন্তু তা পরাজিত হয়েছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের কাছে। কেউ গালি দেয়নি; কেউ পাল্টা ঘৃণা ছড়ায়নি। হাজারো মানুষ একই গান গেয়েছেন, একই আবহে ভিডিও তৈরি করেছেন, একই নান্দনিকতার মাধ্যমে জানিয়েছেন তাদের অবস্থান। প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে সৌন্দর্য। এ বিষয় নিয়েই এবারের সাহিত্য পাতার প্রধান রচনা

মানুষের ইতিহাসে এমন অনেক যুদ্ধ আছে- যেখানে কোনো অস্ত্রের ঝনঝনানি শোনা যায়নি। তবু সে যুদ্ধ পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দিয়েছে। সেখানে কোনো সেনাবাহিনী ছিল না, ছিল না কামানের গর্জন কিংবা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। ছিল একটি গান, একটি কবিতা, একটি নাটক, একটি ছবি কিংবা একজন মানুষের সাহসী উপস্থিতি। ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখা যায়, সংস্কৃতি বহুবার এমন পরিবর্তনের সূচনা করেছে, যেখানে রাজনীতি কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতার প্রভাব সীমিত হয়ে পড়েছে। কারণ সংস্কৃতি মানুষের বাহ্যিক আচরণের চেয়ে তার চেতনা ও মনোজগৎকে গভীরভাবে রূপান্তরিত করে। সমাজে যখন ভয় প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হয়, তখন সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ হয়ে ওঠে মানুষের স্বাধীন চিত্ত। আর সেই স্বাধীন চিত্তের সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রকাশ ঘটে সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে। যে সমাজ গান গায়, কবিতা লেখে, নাটক মঞ্চস্থ করে, নাচে, ছবি আঁকে কিংবা নিজের জীবনকে সৌন্দর্যের ভাষায় প্রকাশ করে, সেই সমাজকে দীর্ঘদিন ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখা যায় না। কারণ, সংস্কৃতি মানুষের আত্মমর্যাদাকে জাগিয়ে তোলে।

সমাজে সব সময়ই এমন কিছু শক্তি থাকে, যারা মানুষের স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। বিশেষ করে নারীর স্বাধীনতা তাদের কাছে সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয়। কারণ, স্বাধীন নারী শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি ধারণা। তিনি প্রশ্ন করেন, সিদ্ধান্ত নেন, নিজের পছন্দকে মূল্য দেন, নিজের জীবন সম্পর্কে নিজেই মত প্রকাশ করেন। এই স্বাধীন সত্তাই কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই ইতিহাসে দেখা যায়, নারীর পোশাক, চলাফেরা, হাসি, গান, শিল্পচর্চা কিংবা জনজীবনে অংশগ্রহণকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা নতুন নয়। যুগে যুগে ক্ষমতাকেন্দ্রিক সমাজ নারীর শরীরকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে। কারণ, তারা জানে, নারীর স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হলে পরিবারের ভেতর প্রশ্ন জন্মাবে, শিক্ষায় নতুন আলো আসবে, সন্তান ভিন্নভাবে বড় হবে, সমাজে সমতার ধারণা শক্তিশালী হবে। অর্থাৎ একজন স্বাধীন নারী কেবল নিজের জীবনই বদলান না, তিনি আগামী প্রজন্মের চিন্তার ভিতও বদলে দেন।

এখানেই সংস্কৃতির সঙ্গে নারীর সম্পর্ক গভীর। সংস্কৃতি মানুষকে শুধু বিনোদন দেয় না; তাকে আত্মপ্রকাশের অধিকার দেয়। একজন নারী যখন গান করেন, কবিতা লেখেন, অভিনয় করেন, নাচেন, ছবি আঁকেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের আনন্দ ভাগ করে নেন, তখন তিনি কেবল একটি শিল্পকর্ম সৃষ্টি করছেন না; তিনি নিজের অস্তিত্বকেও দৃশ্যমান করে তুলছেন। এ দৃশ্যমানতাই অনেকের কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। আমাদের সমাজে ধর্মকে কেন্দ্র করে বহু বিভ্রান্তিও ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা হয়। অনেকেই ধর্ম ও সংস্কৃতিকে একই বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করতে চান। অথচ ধর্ম ও সংস্কৃতি পরস্পর সম্পর্কিত হলেও অভিন্ন নয়। ধর্ম মানুষের বিশ্বাস, উপাসনা ও আধ্যাত্মিক জীবনের বিষয়। সংস্কৃতি মানুষের ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, উৎসব, শিল্প, লোক–ঐতিহ্য ও জীবনযাপনের সম্মিলিত প্রকাশ। একজন মানুষের বিশ্বাস ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সংস্কৃতি তাকে তার ভূখণ্ড, ইতিহাস ও অন্য মানুষের সঙ্গে যুক্ত করে।

বাংলাদেশের সংস্কৃতির দিকে তাকালেই এ সত্য স্পষ্ট হয়। লালন, হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন কিংবা আব্বাসউদ্দীনের সৃষ্টির মধ্যে আমরা যেমন আধ্যাত্মিকতার ছায়া দেখি, তেমনি দেখি মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা, প্রকৃতির প্রতি মুগ্ধতা এবং স্বাধীন চেতনার দীপ্তি। তাদের সাহিত্য ও সংগীত কোনো সংকীর্ণ পরিচয়ের মধ্যে আটকে থাকেনি। বরং মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার শিক্ষা দিয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’। এই একটি পঙ্ক্তিই সংস্কৃতির চূড়ান্ত রাজনৈতিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে। ভয়হীন চিত্ত ছাড়া স্বাধীন সমাজ গড়ে ওঠে না। আর ভয়হীনতার চর্চা শুরু হয় শিল্প ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়েই। কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাও একই সত্য ঘোষণা করেছে। তার কবিতা মানুষের অন্তরে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছিল। কিন্তু সেই বিদ্রোহ ছিল মুক্তির জন্য, মানবমর্যাদার জন্য। তার গান মানুষকে বিভক্ত করেনি; বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহস জুগিয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসেও সংস্কৃতির এই শক্তির অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সংগীত হয়ে উঠেছিল প্রতিরোধের ভাষা। লাতিন আমেরিকায় কবিতা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছিল। অনেক সময় একটি কবিতা পুলিশের লাঠির চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। কারণ লাঠি শরীরকে আঘাত করে, কিন্তু কবিতা মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলে। বাংলাদেশের ইতিহাসও তার ব্যতিক্রম নয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন কেবল রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না, বরং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় রক্ষার সংগ্রাম হিসেবে জাতির চেতনায় স্থায়ী স্থান করে নিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় গান, কবিতা, নাটক ও চিত্রকলা মানুষের মনোবলকে শক্তিশালী করেছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে সাহস জুগিয়েছে, তেমনি কবিদের শব্দ মানুষকে বিশ্বাস দিয়েছে যে স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব। এ কারণেই সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে কখনো হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। একটি নাটক হয়তো সঙ্গে সঙ্গে সরকার বদলে দিতে পারে না, একটি কবিতা হয়তো কোনো আইন বাতিল করতে পারে না, কিন্তু এগুলো মানুষের চিন্তাকে বদলে দেয়। আর মানুষের চিন্তা বদলে গেলে একসময় সমাজ বদলায়, রাষ্ট্রও বদলাতে বাধ্য হয়।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংস্কৃতির নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এ মাধ্যম যেমন ঘৃণা ছড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হতে পারে, তেমনি সংহতি গড়ার জন্যও ব্যবহৃত হতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনায় আমরা দেখেছি, মানুষ একই গানকে ঘিরে এমন এক সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে; যা কোনো সংগঠনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ছিল না; মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সাংস্কৃতিক জাগরণই ছিল তার মূল শক্তি। এ জাগরণ আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে যে প্রতিরোধের ভাষা সব সময় ক্ষোভ নয়। অনেক সময় একটি হাসি, একটি ফুল, একটি গান কিংবা বৃষ্টিভেজা প্রকৃতির মধ্যে দাঁড়িয়ে মানুষের স্বাধীন অস্তিত্ব ঘোষণা করাও একধরনের প্রতিবাদ।

সৌন্দর্য কখনো কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর হয়ে উঠতে পারে। তবে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাফল্য নির্ভর করে তার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রের ওপর। সংস্কৃতি যদি কেবল একটি শ্রেণি বা একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তার শক্তি কমে যায়। কিন্তু যখন গ্রামের কৃষক, শহরের শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিল্পী, শ্রমিক, নারী, পুরুষ, তরুণ, প্রবীণ সবাই একই সাংস্কৃতিক চেতনার অংশ হয়ে ওঠেন, তখন সেই আন্দোলনকে থামানো কঠিন হয়ে যায়।

আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশ- যেখানে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা থাকবে, মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত হবে, শিল্পচর্চা হবে নির্ভয়ে আর নারী-পুরুষ সমান মর্যাদায় নিজেদের সৃজনশীল সত্তাকে প্রকাশ করতে পারবেন। কারণ, সংস্কৃতি শুধু অতীতের ঐতিহ্য বহন করে না, আগামী দিনের সমাজ গড়ার শক্তিও তার মধ্যেই নিহিত। আমাদের মনে রাখতে হবে যে ঘৃণার স্থায়িত্ব খুব কম। ভয়ও দীর্ঘদিন টিকে থাকে না। কিন্তু একটি ভালো গান প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকে। একটি মহান কবিতা শত বছর পরও মানুষকে আন্দোলিত করে। একটি সাহসী সাংস্কৃতিক অবস্থান সময়ের সীমানা অতিক্রম করে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।

সমাজের অন্ধকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী আলো জ্বালায় সংস্কৃতি। কারণ সংস্কৃতিই মানুষের কল্পনাশক্তিকে মুক্তি দেয়, বিবেককে জাগ্রত করে, অন্যের প্রতি সহমর্মিতা গড়ে তোলে এবং স্বাধীনভাবে বাঁচার আকাঙ্ক্ষাকে আরও দৃঢ় করে। যে সমাজ সংস্কৃতিকে ভালোবাসে, সে সমাজ সহজে ঘৃণার কাছে আত্মসমর্পণ করে না। তাই আমাদের সামনে পথ একটাই। অপশক্তির বিরুদ্ধে কেবল রাজনৈতিক সংগ্রাম যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সাংস্কৃতিক জাগরণ। প্রয়োজন এমন সাহিত্য, এমন গান, এমন নাটক, এমন চলচ্চিত্র এবং এমন শিল্পচর্চা, যা মানুষের মধ্যে ভয় নয়, সাহস সৃষ্টি করবে; বিভাজন নয়, সংহতি গড়ে তুলবে; অন্ধ আনুগত্য নয়, মুক্তচিন্তার চর্চা করবে।

কেএমএএ/আপ্র/৩১.০৭.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

শেষ ফোনকল
৩১ জুলাই ২০২৬

শেষ ফোনকল

ছোটগল্প===

কবিতা
৩১ জুলাই ২০২৬

কবিতা

বাবা-সুপারহিরোপূর্ণিয়া সামিয়াতোমাকে বলা হয় না ভালোবাসি,তোমার গাম্ভীর্যতায়এক পৃথিবী আদর মাখা,তোমার শা...

১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরলেন তসলিমা নাসরিন
৩১ জুলাই ২০২৬

১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরলেন তসলিমা নাসরিন

বিতর্কিত আত্মজীবনী ‘দ্বিখণ্ডিত’ প্রকাশকে কেন্দ্র করে সহিংস পরিস্থিতির মুখে যে শহর ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই