মাহবুব নাহিদ
ঘরটির কোনো জানালা নেই, সীমানা নেই; চারপাশ ঘন, কুৎসিত কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। ঘরের ঠিক মাঝখানে একটি গোলাকার মেহগনি কাঠের টেবিল। টেবিলজুড়ে পড়ে আছে অসংখ্য তাজা বুলেটের খোসা, রাসায়নিক অস্ত্রের গন্ধ এবং জমে থাকা লাল রক্ত। সেই রক্ত শুকায় না, কেবল ফুটতে থাকে।
টেবিলের চারপাশে মুখোমুখি বসে আছে সাতটি ছায়ামূর্তি। কাল্পনিক নরকের এই বিশেষ কক্ষে আজ ইতিহাসের সবচেয়ে অভিশপ্ত স্বৈরশাসকদের বৈঠক।
হিটলার তার চোখের চশমাটা বারবার সোজা করছিলেন। টেবিলের ওপর রাখা ম্যাপের দিকে তাকিয়ে হিসহিস করে উঠলেন, ‘সব শেষ হয়ে গেল সামান্য একটা বাঙ্কারে? গেস্টাপোরা কি তবে ঘুমিয়ে ছিল? মানুষ কীভাবে আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সাহস পেল?’ তার পাশ থেকে বিকট অট্টহাসি হেসে উঠলেন বেনিতো মুসোলিনি। নিজের উল্টো হয়ে ঝুলে থাকা লাশের যন্ত্রণা এখনও যেন তার চেহারায় ফুটে উঠছে। তিনি মুচকি হেসে বললেন, ‘আমার দেশের মানুষ আমাকে মিলানের স্কয়ারে উল্টো করে ঝুলিয়ে দিয়েছিল, হিটলার। যখন ভয়ের দেওয়াল ভেঙে যায়, তখন সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বড় জল্লাদ হয়ে ওঠে।’
টেবিলের অন্য পাশে বসে থাকা মুয়াম্মার গাদ্দাফি নিজের রক্তাক্ত পোশাকটা টেনে টুনে ঠিক করার চেষ্টা করছিলেন। চোখে তার এখনও সেই সুয়ারেজ পাইপের অন্ধকার আর ক্ষুব্ধ জনতার চিৎকার। তিনি টেবিল থাপড়ে বলে উঠলেন, ‘আমি তো ওদের আফ্রিকার রাজা বানিয়ে দিতে চেয়েছিলাম! কিন্তু ওরা আমাকে রাজপ্রাসাদ থেকে টেনে বের করে আবর্জনার ড্রেনে নিয়ে গেল... ওহ, কী নির্মম সেই অনুভূতি!’ তার পাশেই চুপচাপ বসে ছিলেন ইদি আমিন। সামনে রাখা মাংশের টুকরোয় ছুরি চালাতে চালাতে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘ভয় দিয়ে শাসন করা সহজ, গাদ্দাফি। কিন্তু ভয় যখন ক্ষোভে রূপ নেয়, তখন সেনাবাহিনীও আর রক্ষা করতে পারে না। আমার নিজের দেশেও আমার জায়গা হয়নি, পরবাসে কাটল শেষ জীবন।’
হঠাৎ টেবিলের কোণে বসে থাকা বাশার আল-আসাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার হাতে তখনও রাসায়নিক পোড়ার দাগ। তিনি বিড়বিড় করলেন, ‘আমি গোটা দেশটাকেই ধ্বংসস্তূপ বানিয়ে দিলাম, তাও কি নিজের মানুষকে মানাতে পারলাম? একটা ধোঁয়াটে ধ্বংসস্তূপের ওপর রাজত্ব করা আর নরকে বসে থাকার মধ্যে কোনো তফাৎ নেই।’
সবাই যখন নিজেদের পতনের যন্ত্রণায় মগ্ন, তখন টেবিলের একপ্রান্তে বসে থাকা শেখ মুজিব একটা ভারী ফাইল উল্টাচ্ছিলেন। মুখ নীচু করেই বললেন, ‘একদলীয় শাসনের স্বপ্নটা আমিই প্রথম তৈরি করেছিলাম। কিন্তু বাকশাল দিয়ে যে ইতিহাস ঢাকা যায় না, তা বোঝার আগেই সব শেষ হয়ে গেল।’ ঠিক তার পাশেই জবুথবু হয়ে বসেছিলেন তার কন্যা শেখ হাসিনা। চেহারা জুড়ে পলাতক জীবনের চরম অপমান আর আতঙ্ক। তিনি থরথর করে কাঁপছিলেন।
হিটলার হঠাৎ শেখ হাসিনার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে গর্জে উঠলেন, ‘তুমি নাকি আধুনিক প্রযুক্তির ‘‘বিগ ব্রাদার’’ হয়ে উঠেছিলে? ডিজিটাল আইন, গুমের সংস্কৃতি, আর ঞযড়ঁমযঃ চড়ষরপব দিয়ে মানুষকে স্তব্ধ করে রেখেছিলে? তাহলে তোমার শাসনের শেষ পরিণতি কী হলো?’
শেখ হাসিনা নিচু গলায়, কাঁপা কণ্ঠে উত্তর দিলেন, ‘আমি ওদের ওপর হাজার হাজার বুলেট চালিয়েছিলাম... পুরো দেশকে ডিজিটাল নজরদারিতে আটকে রেখেছিলাম... ভেবেছিলাম এই সিংহাসন আমার চিরকালের।’
গাদ্দাফি মুখ বিকৃত করে সামনে ঝুঁকে এলেন, ‘তারপর? তোমার সেই হাজার হাজার বুলেট আর পুলিশ কোথায় গেল?’
‘ওরা... ওরা ভয় পাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল,’ শেখ হাসিনা কেঁদে ফেললেন, ‘পাঁচই আগস্ট লক্ষ লক্ষ মানুষ যখন রাজপথে নেমে এলো, আমার নিজের তৈরি সেনাপতিরা পর্যন্ত আমার পাশে দাঁড়ায়নি। এক কাপড়ে হেলিকপ্টারে উঠে পালিয়ে যেতে হয়েছিল আমাকে... ইতিহাসে এতটা অপমানের পতন আর কারও হয়নি!’
পুরো ঘরে এক ভূতুড়ে নীরবতা নেমে এলো।
ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে হঠাৎ একটা যান্ত্রিক, শীতল কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, অরওয়েলের সেই ‘বিগ ব্রাদার’-এর রূপক ছায়া।
ছায়ামূর্তিটি বলল, ‘তোমরা ভেবেছিলে বুলেট, বন্দুক আর নজরদারি দিয়ে মানুষকে আজীবন গোলাম বানিয়ে রাখা যায়। কিন্তু তোমরা ভুলেই গিয়েছিলে, যে ক্ষমতার ভিত্তি তৈরি হয় মানুষের রক্তের ওপর, তার শেষ পরিণতি হয় এই নরকের টেবিলে।’
আচমকা টেবিলের ওপর জমে থাকা রক্ত ফুটতে শুরু করল। ওপর থেকে নেমে এলো আগুনের শিকল। সাতজন একনায়ক একসঙ্গে তীব্র আর্তনাদ করে উঠলেন, কিন্তু সেই আর্তনাদ শোনার মতো কোনো প্রজা বা অনুগত বাহিনী সেখানে ছিল না। কারণ, ইতিহাসে স্বৈরাচারের পতন একা এবং চরমতম লাঞ্ছনার মধ্য দিয়েই সম্পূর্ণ হয়।
কেএমএএ/আপ্র/১০.০৯.২০২৬