মাহাবুব রহমান বিপ্লব
থানার বারান্দায় মেয়েটি যখন এসে দাঁড়াল, তার চোখে-মুখে তখন চরম আতঙ্ক আর অসহায়ত্বের ছাপ। মনে হচ্ছিল, কোনো অজানা বিপদ তাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু পরক্ষণেই যখন তাকে শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করা হলো, “কী হয়েছে বোন? কোনো বিপদে পড়েছেন?” মেয়েটি যেন এক মুহূর্তের জন্য নিজের সমস্ত ভয়কে আড়াল করতে অদ্ভুত এক রাগের আশ্রয় নিলো। চোখ রাঙিয়ে বলে উঠল, “আমি কেন আপনাকে বলব? আপনার সঙ্গে কি আমার কোনো পরিচয় আছে?”
কথা শুনে একটু অবাক হলেও উত্তর এল শান্ত স্বরে, “ঠিক আছে, বলতে না চাইলে বলতে হবে না।”
এভাবেই শুরু।
একচিলতে রাগ আর অভিমানের আড়ালে, অচেনা দুজন মানুষের মধ্যে সেদিন যে কথোপকথনের শুরু হয়েছিল, কে জানত, একদিন সেটিই হয়ে উঠবে একটি চেনা ইতিহাসের প্রথম পৃষ্ঠা।
মেয়েটির নাম নদী। আর কোনো কিছু না ভেবেই তার সেই কঠিন বিপদের দিনে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল সাগর।
নদী আর সাগর-দুটি নাম যেন পাশাপাশি থাকার জন্যই জন্মেছিল। কিন্তু আমাদের চেনা সমাজ কি আর এত সহজে দুটি মানুষের হৃদয়ের ভাষা বুঝতে চায়? নিঃস্বার্থ উপকার, নির্মল বন্ধুত্ব কিংবা বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানো-এসবকেও সমাজ অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখে। একটি হিন্দু মেয়ে আর একটি মুসলিম ছেলের প্রতিদিনের মেলামেশা এবং একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোকে সমাজও তাই বেশি সময় নিলো না ‘অপবাদ’-এর নোংরা রঙে রাঙিয়ে দিতে।
লোকনিন্দার ভয়ে একদিন নদীর মা সাগরকে আড়ালে ডেকে অত্যন্ত করুণ সুরে বললেন, “বাবা, তুমি আমাদের অনেক উপকার করেছ। কিন্তু সমাজ তো ভালো বলছে না। তুমি কাল থেকে আর আমাদের বাড়িতে এসো না।”
কথাগুলো হয়তো মায়ের অসহায়তা থেকে বলা। কিন্তু নদীর কাছে সেগুলো যেন ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছুড়ে দেওয়া এক অদৃশ্য পাথর।
বাড়ি ফিরে নদী আর চুপ থাকতে পারল না। ক্ষোভে-অভিমানে ফেটে পড়ে মাকে বলল, “কিসের অপবাদ? কিসের সমাজ? সাগর আমার বিপদের বন্ধু। আমি প্রতিদিন ওদের বাড়ি যাব, দেখি কে আটকায়!”
সেদিন হয়তো নদী শুধু মায়ের বিরুদ্ধেই দাঁড়ায়নি; দাঁড়িয়েছিল সেই সমাজের বিরুদ্ধেও, যে সমাজ মানুষের হৃদয়ের আগে তার ধর্মের পরিচয় দেখে।
সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে গড়ে উঠল এক গভীর আন্তরিকতা। শুধু প্রেম নয়, জীবনের বাস্তবতাকেও তারা পাশাপাশি বয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। নিজেদের জীবিকা নির্বাহের জন্য দুজনে বেছে নিলো একই পেশা।
কিন্তু সুখের দিনগুলো যেন সত্যিই বড় অল্পায়ু।
কিছুদিন যেতে না যেতেই হঠাৎ আসমানী মেঘের মতো দুর্যোগ নেমে এল নদীর পরিবারে। তার বাবা মারাত্মক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের বিছানায় শায়িত হলেন। ডাক্তার জানালেন, বড় অপারেশন করতে হবে।
গ্রামীণ সেই হাসপাতালের করিডোরে তখন নদী যেন একা। পাশে দাঁড়িয়ে সাহস দেওয়ার মতো কেউ নেই। আপনজনেরাও কেমন যেন দূরে সরে গেল। বিপদের সময় মানুষ কখনো কখনো বুঝতে পারে, চারপাশে কত মানুষ থাকলেও সত্যিকারের আপনজন কত কম।
উপায়হীন হয়ে নদী মোবাইল ফোনে কল করল সাগরকে।
সাগর এক মুহূর্তও দেরি করল না। নিজের সমস্ত কাজ ফেলে ছুটে গেল হাসপাতালে।
দিন গড়িয়ে রাত হলো। রাত গড়িয়ে আবার দিন। কিন্তু সাগরের চোখে ঘুম নেই। নদীর বাবার শিয়রে বসে সে পরম যত্নে সেবা করতে লাগল। মাথায় জল দিলো, সময়মতো ওষুধ এনে দিলো, প্রয়োজনীয় সবকিছুর খোঁজ রাখল-যেন তিনি তার নিজেরই জন্মদাতা পিতা।
এই চরম সংকটের দিনে সাগরের এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ আর মানবিকতা নদীর হৃদয়ের ভেতর অদৃশ্য এক দরজা খুলে দিলো। সে নিজের অজান্তেই সাগরের প্রেমের সাগরে হাবুডুবু খেতে লাগল।
সেদিন নদীর কাছে সৌন্দর্যের সংজ্ঞাটাই বদলে গেল।
চেহারার সৌন্দর্য নয়, ধর্মের পরিচয় নয়, সমাজের বিধিনিষেধ নয়-সে প্রেমে পড়ল সাগরের সুন্দর ও বিশাল মনের। যে মন বিপদের দিনে মানুষের পাশে দাঁড়াতে জানে, যে মন কোনো বিভেদের হিসাব করে না।
ওষুধ আর সেবার কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু বিধাতার লিখন ছিল অন্যরকম।
অপারেশনের ধকল কাটিয়ে আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা হলো না তাঁর। হাসপাতালের সাদা বিছানাতেই নদীর বাবা জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে চিরতরে চোখ বুজলেন।
একটি পরিবারের মাথার ওপর থেকে সেদিন যেন ছায়াটুকুও সরে গেল।
হাসপাতাল থেকে বাবার মৃতদেহ যখন গ্রামে আনা হলো, তখন শুরু হলো সমাজের আরেক চরম নিষ্ঠুরতা।
সনাতন ধর্মের গ্রামবাসী ও সমাজপতিরা সাফ জানিয়ে দিলো, মুসলমান ছেলের সঙ্গে ওঠাবসা করা এই পরিবারের লাশের সৎকারে তারা কেউ শ্মশানে যাবে না। এমনকি স্থানীয় ঠাকুরও ফতোয়া দিলেন, তিনি এই লাশের কোনো ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করবেন না, মুখাগ্নিও করবেন না।
একজন মৃত মানুষের শেষযাত্রাতেও ধর্মের দেয়াল!
মৃত্যুর কাছে যেখানে সব পরিচয় মুছে যাওয়ার কথা, সেখানেও মানুষ মানুষকে ভাগ করে দিলো ধর্মের নামে।
এই অমানবিক দৃশ্য দেখে সাগরের বুক কেঁপে উঠল। কিন্তু সে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সমাজের ভয় কিংবা ধর্মের সংকীর্ণতার কাছে মাথা নত করার মানুষও সে নয়।
সাগর দূর গ্রাম থেকে তার পরিচিত এক উদারপন্থী ঠাকুরকে খুঁজে নিয়ে এল।
তারপর যখন সাগর আর সেই নতুন ঠাকুর লাশ কাঁধে নিয়ে শ্মশানের দিকে রওনা দিলেন, তখন সেই দৃশ্য দেখে গ্রামেরই কিছু হিন্দু যুবকের চক্ষুলজ্জা আর সুপ্ত মানবতা জেগে উঠল।
তারা ভাবল, একজন মুসলিম যুবক যদি জাত-ধর্মের হিসাব ভুলে একজন হিন্দু মানুষের শেষযাত্রায় লাশের পাশে দাঁড়াতে পারে, তবে আমরা কেন পারব না?
মানুষের ভেতরের মানুষটি শেষ পর্যন্ত জেগে উঠল।
একজনের মানবিকতা আরেকজনের বিবেককে নাড়া দিলো। শেষ পর্যন্ত সমস্ত ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে শ্রদ্ধার সঙ্গে নদীর বাবার দেহটি শ্মশানের মাটিতে বিলীন করা হলো।
কিন্তু সেদিন শুধু একটি দেহের সৎকার হয়নি। হয়তো নীরবে সৎকার হয়েছিল ধর্মের নামে গড়ে ওঠা কিছু নিষ্ঠুর অহংকারেরও।
শ্মশানের আগুন তখনো পুরোপুরি নেভেনি। চারপাশে তখনো মৃত্যুর গন্ধ, চোখে অশ্রু আর বাতাসে ভারী শোক।
বাবার মৃত্যুর এই গভীর শোক বুকে নিয়েই নদী হঠাৎ সাগরের দুহাত শক্ত করে ধরে বলল, “সাগর, এই সমাজ আমাদের বাঁচতে দেবে না। তুমি কি পারবে আজকেই আমাকে বিয়ে করে এখান থেকে দূরে নিয়ে যেতে?”
সাগরের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না।
কিছু প্রশ্নের উত্তর মুখে দিতে হয় না। চোখের ভাষাই তখন যথেষ্ট হয়ে ওঠে।
সেই রাতেই দুজনে মিলে পাড়ি দিলো দূর রাজধানী ঢাকার বুকে।
শহরের এক কোণে ছোট্ট একটি টিনের ঘর ভাড়া নিয়ে শুরু হলো তাদের নতুন জীবনের সংগ্রাম। জীবিকার তাগিদে দুজনে দুই ভিন্ন গার্মেন্টসে চাকরি নিলো।
জীবন সেখানে সহজ ছিল না। কিন্তু ভালোবাসা কখনো কখনো মানুষের কঠিন জীবনকেও মায়ায় ভরে দিতে পারে।
প্রতিদিন সাগরের গার্মেন্টস আধা ঘণ্টা আগে ছুটি হয়ে যেত। আর ছুটি হতেই সে নিজের ক্লান্তি ভুলে এক মুহূর্ত দেরি না করে একটি নীল রঙের ছাতা হাতে নিয়ে রোদে পুড়ে কিংবা ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে নদীর গার্মেন্টসের গেটের সামনে গিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত।
হাজারো শ্রমিকের ভিড়ের মধ্যে নদী যখন বের হতো, সাগরের সেই নীল ছাতা আর চেনা মুখটি দেখেই তার সারাদিনের সব ক্লান্তি এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে যেত।
তারপর দুজনে এক ছাতার নিচে হাত ধরে গল্প করতে করতে হেঁটে বাড়ি ফিরত।
বাইরের পৃথিবী হয়তো তাদের জন্য কঠিন ছিল। কিন্তু সেই এক ছাতার নিচে দুজনের জন্য যেন আলাদা একটি পৃথিবী তৈরি হয়েছিল।
রোদ-বৃষ্টি, অভাব-অনটন, ক্লান্তি-সংগ্রাম-সবকিছুর মধ্যেও এমন হাজারো মিষ্টি আর সাধারণ স্মৃতিতে ভরে উঠেছিল ঢাকার সেই কষ্টের, কিন্তু ভালোবাসায় পূর্ণ জীবন।
কয়েক বছর পর শহরের যান্ত্রিকতা ছেড়ে তারা আবার মাথা উঁচু করে ফিরে এল চিরচেনা গ্রামের বাড়িতে।
গ্রামের মাটিতে ফিরে এসে দুজনে আবার একসঙ্গে পেশাগত কাজ শুরু করল।
সময়ের সঙ্গে হয়তো মানুষের চোখও বদলে যায়।
গ্রামের মানুষ এবার আর তাদের দিকে বাঁকা চোখে তাকাল না। বরং সকাল-সন্ধ্যা এই জুটিকে একসঙ্গে পথ চলতে দেখে সবাই একবাক্যে বলতে শুরু করল, “এরাই এই এলাকার শ্রেষ্ঠ জুটি!”
দেখতে দেখতে তাদের সেই সুখী সংসারের আঙিনা আলো করে জন্ম নিলো দুটি ফুটফুটে পুত্রসন্তান।
সংসারে তখন আর কোনো অভাব নেই।
ঘরভরা হাসি-খুশি, গোয়ালভরা গরু-ছাগল আর উঠানভরা হাঁস-মুরগিতে তাদের সংসারটি যেন একটি ছোট্ট স্বর্গ হয়ে উঠেছিল।
চারপাশের মানুষ তাদের এই সুখ আর উন্নতি দেখে হিংসা নয়, প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতো।
সাগরের বিশালতা আর নদীর বহমান ভালোবাসায় তাদের সংসারটি যেন এক আদর্শ রূপ ধারণ করেছিল।
মনে হচ্ছিল, এত ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে অবশেষে তারা বুঝি জীবনের তীরে এসে পৌঁছেছে।
কিন্তু নিয়তির খেলা বড়ই অদ্ভুত। কখনো কখনো মানুষ যখন মনে করে, তার সব দুঃখের অবসান হয়েছে, তখনই অদৃশ্য নিয়তি সবচেয়ে নির্মম আঘাতটি হেনে বসে।
সব যখন ঠিকঠাক চলছিল, ঠিক তখনই এক অমাবস্যার রাতে হঠাৎ কোথা থেকে এক বিধ্বংসী আসমানী ঝড় ধেয়ে এলো।
সেই ঝড়ের তীব্র তাণ্ডবে নিমেষের মধ্যে ওলটপালট হয়ে গেল তাদের এত বছরের তিল তিল করে গড়ে তোলা সুখের রাজপ্রাসাদ।
যে সংসার একদিন সমাজের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে গড়ে উঠেছিল, যে সংসার অভাবের সঙ্গে লড়াই করে ভালোবাসায় পূর্ণ হয়েছিল, যে সংসারের উঠানে দুটি শিশুর হাসি প্রতিদিন নতুন সূর্যের মতো আলো ছড়াত-এক আসমানী ঝড় এসে মুহূর্তেই সবকিছু তছনছ করে দিলো।
সাগরের বুক থেকে নদী, কিংবা নদীর বুক থেকে সাগরকে চিরতরে কেড়ে নিয়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল সাজানো সংসার।
একদিন যে দুজন মানুষ এক ছাতার নিচে পথ চলেছিল, নিয়তির নির্মম ঝড়ে তাদের সেই পথই হয়ে গেল দুই বিপরীত দিকের।
আর সেই শ্রেষ্ঠ জুটিটিকে চিরকালের মতো পর করে দিয়ে, ভালোবাসার সেই দীর্ঘ উপাখ্যানটিকে এক বিষাদময় অন্ধকারে ঢেকে গেল গল্পটি...।
কিছু গল্পের শেষ হয় না।
শুধু চরিত্রগুলো একদিন নীরবে হারিয়ে যায়, আর তাদের ভালোবাসা পড়ে থাকে মানুষের স্মৃতির ভেতর।
নদী আর সাগরের গল্পও হয়তো তেমনই একটি গল্প-যেখানে ধর্মের দেয়ালকে হার মানিয়েছিল মানবতা, সমাজের অপবাদকে হার মানিয়েছিল ভালোবাসা, আর শেষ পর্যন্ত সবকিছুকে হার মানিয়ে দিয়েছিল এক অদৃশ্য আসমানী ঝড়।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক, রংপুর
কেএমএএ/আপ্র/১০.০৯.২০২৬