রাজধানীর খিলগাঁওয়ের ত্রিমোহনীতে জিরানী খালের পানিতে ভাসমান অবস্থায় অজ্ঞাত এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের প্রায় ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর পরিচয় ও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনের দাবি করেছে পুলিশ। নিহত ব্যক্তির নাম মো. জজ মিয়া, বয়স ৪৪ বছর। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মো. আব্দুল্লাহ নামে ৩৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে আরও কয়েকজন জড়িত বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার হারুন অর রশিদ এসব তথ্য জানান।
পুলিশ জানায়, গত ৯ সেপ্টেম্বর সকালে খিলগাঁও থানাধীন ত্রিমোহনী ব্রিজের নিচে জিরানী খালের পানিতে ভাসমান অবস্থায় অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। একই সঙ্গে নিহতের পরিচয় শনাক্ত, হত্যার কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা এবং বিভিন্ন আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু হয়।
তদন্তের একপর্যায়ে নিহত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত হয়। পুলিশ জানায়, তাঁর নাম মো. জজ মিয়া। তিনি নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মসুরাকান্দার বুইদ্দার বাজার এলাকার মো. আনোয়ার হোসেনের ছেলে। তাঁর মায়ের নাম বেগম। তিনি বর্তমানে রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় বসবাস করতেন।
নিহতের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর হত্যাকাণ্ডের কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে তদন্ত আরও জোরদার করা হয়। সাক্ষ্য-প্রমাণ, নিহতের মুঠোফোনের কলের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা বিশ্লেষণ করে পুলিশ হত্যাকাণ্ডের একটি ধারাবাহিকতা পায় বলে জানিয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ সেপ্টেম্বর জজ মিয়া খিলগাঁওয়ের বাসা থেকে বের হন। পরদিন রাত ১২টা ২৮ মিনিটের দিকে তিনি বাড্ডা থানাধীন মেরুল বাড্ডার মতি বাবুর বাউন্ডারির ভেতরে থাকা মিন্টুর গ্যারেজে যান।
পুলিশের দাবি, সেখানে আগে থেকেই আব্দুল্লাহসহ আরও কয়েকজন অবস্থান করছিলেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁরা জজ মিয়াকে ধারালো চাকু দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করেন। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে লাশটি খিলগাঁওয়ের ত্রিমোহনী ব্রিজের নিচে জিরানী খালে ফেলে দেওয়া হয়।
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আব্দুল্লাহকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি মো. ফুলচান হোসেনের ছেলে এবং বর্তমানে মেরুল বাড্ডার আনন্দনগর এলাকায় থাকেন।
পুলিশের ভাষ্য, গ্রেপ্তার আব্দুল্লাহকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে একটি তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁর দাবি, নিহত জজ মিয়া তাঁর এক সহযোগীর স্ত্রীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এ কারণে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, শুধু আব্দুল্লাহর ওই বক্তব্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের কারণ চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। জজ মিয়ার সঙ্গে ওই নারীর কথিত সম্পর্কই হত্যার প্রকৃত কারণ কি না, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে-তা যাচাই করে দেখছে পুলিশ।
ঘটনার সঙ্গে আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তদন্তের স্বার্থে তাঁদের নাম-পরিচয় এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন উপকমিশনার হারুন অর রশিদ।
লাশ উদ্ধারের পর অজ্ঞাতনামা হিসেবে তদন্ত শুরু করে অল্প সময়ের মধ্যে নিহতের পরিচয় শনাক্ত এবং একজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনাকে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডের পুরো রহস্য উদঘাটনে গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ, অন্যান্য জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং সংগৃহীত আলামত বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় নিহত জজ মিয়ার স্ত্রী রোজিনা বাদী হয়ে খিলগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন।
পুলিশ আরও জানায়, নিহত জজ মিয়ার বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে কমপক্ষে আটটি মামলা রয়েছে। তবে এসব মামলার সঙ্গে তাঁর হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ কোনো তথ্য দেয়নি।
খিলগাঁওয়ের ত্রিমোহনী ব্রিজের নিচে খালের পানিতে ভাসমান অবস্থায় লাশ উদ্ধারের পর শুরু হওয়া তদন্তে জজ মিয়ার পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য স্থান ও সময়েরও একটি চিত্র পেয়েছে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ, কলের তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিকতা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, হত্যার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং জজ মিয়াকে হত্যার পর তাঁর লাশ খালে ফেলে দেওয়ার পুরো ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। পুলিশ বলছে, তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে সব তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না।
সানা/আপ্র/১১/৯/২০২৬