জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, ভারতের সঙ্গে হওয়া ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করছে সরকার। এ বিষয়ে পর্যালোচনার ফলাফল শিগগিরই জানানো হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। গতকাল (১০ সেপ্টেম্বর) বৃহস্পতিবার সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষ হওয়ার পর আজ শুক্রবার জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে সরকারদলীয় অন্যান্য হুইপও উপস্থিত ছিলেন।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারসংক্রান্ত চুক্তির আওতায় বন্ধুরাষ্ট্রের জাহাজ চলাচল এবং ওই চুক্তি বাতিলের বিষয়ে এক সাংবাদিক জানতে চাইলে চিফ হুইপ বলেন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে করা চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ১০১টি সমঝোতা স্মারক নিয়েও আলোচনা চলছে এবং এ বিষয়ে অনতিবিলম্বে ফল পাওয়া যাবে।
চিফ হুইপ জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন নয় কার্যদিবসের ছিল। এ অধিবেশনে ছয়টি বিল উত্থাপন ও পাস হয়েছে। বিভিন্ন বিধিতে মোট ১ হাজার ৬৭৮টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নিজে ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।
সংবিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর সংসদের অধিবেশন বসার ধারাবাহিকতায় তৃতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে নূরুল ইসলাম বলেন, আগামী অধিবেশনও একই ধারায় অনুষ্ঠিত হবে।
ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনে ১৮(ক) ধারা যুক্ত করা এবং পরে সমালোচনার মুখে তা বাদ দিয়ে বিল পাসের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি দেশের আর্থিক অবস্থান শক্তিশালী করার উদ্যোগের অংশ ছিল। পরে কেউ আগ্রহ না দেখানোয় ওই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। সব বিষয় একসঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব
সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যসংখ্যা ও সভাপতির পদ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, অতীতে বিরোধী দল থেকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করার নজির খুব বেশি নেই। তবে সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি করা হয়েছে সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে।
সরকারি অর্থ ব্যয়ের জবাবদিহির ক্ষেত্রে সরকারি হিসাব কমিটি সংসদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কমিটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সব মন্ত্রণালয়সহ সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে এই কমিটির কাছে জবাব দিতে হয়।
নূরুল ইসলাম বলেন, মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত ৩৯টি স্থায়ী কমিটির মধ্যে ২৪টিতে বিরোধী দলের সদস্য রাখা হয়েছে। সংসদে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্বের অনুপাতে হিসাব করলে এ সংখ্যা কিছুটা বেশি। এর মধ্যে ২২টি কমিটিতে বিরোধী দলের তিনজন করে সদস্য এবং অন্য কমিটিগুলোতে দুজন করে সদস্য রাখা হয়েছে।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে সুরক্ষা পাবেন বাবা-মা
তৃতীয় অধিবেশনে পাস হওয়া ছয়টি বিলের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনীকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, এর ফলে বাবা-মা জীবদ্দশায় সন্তানকে সম্পত্তি দান বা হস্তান্তর করার পরও ওই সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার পাবেন।
বৃদ্ধ মা-বাবার সুরক্ষাই এই সংশোধনের অন্যতম লক্ষ্য জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়ার পর বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হয় কিংবা তাঁদের ভরণপোষণও হয় না। নতুন আইনে তাঁদের জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগের অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এই অধিবেশনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল পাস হয়েছে উল্লেখ করে নূরুল ইসলাম বলেন, বিল দুটি তৈরির আগে বিভিন্ন অংশীজন, আইনজীবী, বিচারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সাংবাদিকদের মতামত নেওয়া হয়েছে। ১৬ জন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গেও আলোচনা করে তাঁদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, অধ্যাদেশে শাস্তির ক্ষেত্রে যে সীমা ছিল, পাস হওয়া বিলে তা আরও কঠোর করা হয়েছে। এমনকি মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক
বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে উল্লেখ করে চিফ হুইপ বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
বাংলাদেশ সব প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় জানিয়ে তিনি বলেন, যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ বেশি, তাদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে দেশের যথাযথ মর্যাদার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হবে।
পাঁচ মাসে ২০৫ কোটি ডলারের ঋণ পরিশোধ
সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা তুলে ধরে নূরুল ইসলাম বলেন, আগের হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া ২০৫ কোটি ডলারের ঋণ গত পাঁচ মাসে পরিশোধ করা হয়েছে। এই অর্থ জনগণের করের টাকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধে বর্তমান সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সরকারি অর্থের একটি টাকাও অপচয় না করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের সমালোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অন্তত দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগে। ফলে চাইলেই দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়।
বিদ্যুৎ খাতে আগের সরকারের বিভিন্ন চুক্তি ও দায়মুক্তির সমালোচনা করে চিফ হুইপ বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও কিছু কেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। এতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। আগের সরকারের করা দায়মুক্তির বিধান বাতিল করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নির্ধারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিবর্তে সরকারকে সরাসরি ক্ষমতা দেওয়ার ব্যবস্থারও সমালোচনা করেন তিনি।
‘জুলাই সনদের পুরোটা বাস্তবায়ন হবে’
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার জানিয়ে নূরুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান দাড়ি, কমা, সেমিকোলন পর্যন্ত পরিষ্কার। সরকার জুলাই সনদের পুরোটা বাস্তবায়ন করবে।
তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদ সই হয়েছে। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এটি বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। তাই সরকার জুলাই সনদ শতভাগ বাস্তবায়ন করবে।
চিফ হুইপ বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সংবিধান সংশোধন ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। বিরোধী পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংবিধান সংশোধন করা হলে তা সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ তৈরি হবে। তবে সংস্কার করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতেই হবে।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন ও সংশোধনের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছে এবং পরে বিভিন্ন সময়ে এতে সংশোধনী আনা হয়েছে। ভারতেও সংবিধান বহুবার সংশোধন করা হয়েছে।
সানা/আপ্র/১১/৯/২০২৬