অন্য কোথাও না, যেখানে প্রতিনিয়ত আইন আর অধিকারের দাবি উত্থাপন ও নিষ্পত্তি হয়-খোদ সেই পাইকগাছা আদালতের বটতলা প্রাঙ্গণেই বসে ডাব বিক্রি করেন তিনি। চারপাশে বিচারপ্রার্থীদের ভিড়, আইনজীবীদের ব্যস্ততা, আর ন্যায়বিচারের আনাগোনা-তার মাঝেই নীরবে টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন এক অশীতিপর মানুষ।
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালী ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর গ্রামের মৃত গহর সরদারের পুত্র জবেদ আলী সরদার আজও জীবিকার তাগিদে আদালত চত্বরে ডাব বিক্রি করেন। নিজের দাবি অনুযায়ী তাঁর বয়স ১২৮ বছর। সংখ্যাটি নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে, সত্যতা যাচাইয়ের বিষয়ও আছে-তবু তাঁর কুঁচকে যাওয়া মুখ, নুয়ে পড়া শরীর আর রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে টিকে থাকার বাস্তবতা অস্বীকার করা কঠিন।
জীবনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ কেন এখনো এভাবে জীবিকার কঠিন সংগ্রামে নামতে বাধ্য হন-এই প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসে বারবার। তাঁর কি কোনো আপনজন নেই? পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র-কেউ কি পারেনি তাঁর এই ক্লান্ত কাঁধের ভারটুকু ভাগ করে নিতে? ফোনে খোঁজ-খবর জানার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি তেমন তথ্য। স্থানীয়দের অনেকেই জানান, জবেদ আলী নাকি সক্রিয় থাকার জন্যই এই বয়সেও এভাবে রাস্তায় বসে ডাব বিক্রি করেন।
পাইকগাছা আদালতের সিনিয়র আইনজীবী প্রশান্ত মণ্ডল সম্প্রতি তার ফেসবুক আইডিতে জবেদ আলীকে নিয়ে তিন বাক্যের একটি স্ট্যাটাস দেন। সেই স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। অনেকেই মন্তব্য করেছেন, যাতে স্পষ্ট-এই দৃশ্য শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়; এটি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার এক নীরব প্রতিচ্ছবি।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে একাকী অবস্থায় এক বৃদ্ধ মায়ের মৃত্যুর ঘটনা প্রবীণদের জীবনযাপন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবারে সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত হলেও শেষ বয়সে একাকীত্ব, অবহেলা এবং নিরাপত্তাহীনতা অনেক প্রবীণের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশে প্রবীণদের জন্য কিছু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি রয়েছে। এর মধ্যে ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব অসচ্ছল নাগরিকদের জন্য বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি অন্যতম, যেখানে মাসিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং অসহায় ও দুঃস্থ মানুষের জন্য বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিও চালু রয়েছে।
সরকারিভাবে কিছু প্রবীণ নিবাস বা আশ্রয়কেন্দ্রও রয়েছে, যেখানে অসহায় ও পরিত্যক্ত প্রবীণদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। তবে বাস্তবে এসব সুবিধা অনেকের কাছে পৌঁছায় না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে জীবনের শেষপ্রান্তে এসেও অনেক প্রবীণকে জীবিকার জন্য রাস্তায় নামতে হয়।
সমাজকর্মী ও মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, প্রবীণদের জন্য কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো-যেখানে স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, মানসিক সহায়তা এবং পারিবারিক দায়িত্ববোধ একসঙ্গে কার্যকর থাকবে।
জবেদ আলী সরদারের মতো মানুষের জীবন তাই কেবল একটি ব্যক্তিগত কাহিনি নয়। এটি এক অন্ধ সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি-যেখানে উন্নয়নের হিসাবের ভিড়ে হারিয়ে যায় সবচেয়ে অসহায় মানুষটির নীরব সংগ্রাম।
আদালতের বটতলায় বসে থাকা এই মানুষটি যেন শেষ পর্যন্ত আমাদেরই দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেন-একটি সভ্য সমাজে জীবন কি সত্যিই এতটা একা হতে পারে?
সানা/কেএমএএ/আপ্র/১৫/৬/২০২৬