বাংলাদেশকে ব্যবহার করে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা সন্ত্রাসী সেল ও নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে-জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের এই সতর্কবার্তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া জরুরি। এটি কেবল সম্ভাব্য একটি নিরাপত্তাঝুঁকির তথ্য নয়; বরং বাংলাদেশের জঙ্গিবাদবিরোধী প্রস্তুতি, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রীয় সমন্বয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার মতো একটি সতর্ক সংকেত। এখন বড় হামলা ঘটার অপেক্ষায় থাকলে চলবে না; বরং হামলার আগেই নেটওয়ার্ক শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
জঙ্গিবাদের কৌশল বদলে গেছে। একসময় বড় আস্তানা, প্রশিক্ষণশিবির, অস্ত্রের মজুত কিংবা দৃশ্যমান সাংগঠনিক কাঠামো ছিল নিরাপত্তা সংস্থার নজরদারির প্রধান বিষয়। এখন সেই জায়গা নিয়েছে ছোট, বিচ্ছিন্ন ও পরস্পর-সংযুক্ত সেল; গোপন অর্থসংস্থান; স্থানীয় যোগাযোগ; অনলাইন প্রচারণা এবং ব্যক্তি পর্যায়ে উগ্রবাদে প্ররোচনা। ফলে একটি সংগঠনের দৃশ্যমান উপস্থিতি না থাকলেও তার কার্যক্রম সক্রিয় থাকতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখার বাংলাদেশে সেল প্রতিষ্ঠা ও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের আগ্রহের কথা এসেছে। একই সঙ্গে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকেন্দ্রিক সন্ত্রাসী তৎপরতার আঞ্চলিক প্রভাবের আশঙ্কাও রয়েছে। আল-কায়েদার সঙ্গে বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীর যোগাযোগ, সীমান্তবর্তী অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা এবং অনলাইনভিত্তিক উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের বিস্তার-সব মিলিয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিকল্পনাকে এখন আর শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই।
রাষ্ট্রকে প্রথমেই গোয়েন্দা সক্ষমতার নতুন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, আর্থিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান, সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং সাইবার নজরদারি ব্যবস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় হতে হবে দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর। সন্দেহজনক অর্থপ্রবাহ, গোপন অর্থসংস্থান, জঙ্গি প্রচারণা, অনলাইন নিয়োগ, ভুয়া পরিচয়, সীমান্তপথে যোগাযোগ এবং সরবরাহ নেটওয়ার্ক-সবকিছুকে একই নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।
তবে শুধু অভিযান দিয়ে এ হুমকি মোকাবিলা সম্ভব নয়। তরুণদের অনলাইন উগ্রবাদে আকৃষ্ট হওয়ার সামাজিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক কারণ চিহ্নিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি খাত ও নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করে প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি গড়ে তুলতে হবে। কারাগারে থাকা জঙ্গিদের পুনর্বাসন ও মতাদর্শগত পুনর্গঠনের বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন, যাতে কারাগার নতুন নিয়োগকেন্দ্রে পরিণত না হয়।
সবচেয়ে জরুরি হলো, জাতিসংঘের সতর্কবার্তাকে রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়া। নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময়, সীমান্ত নজরদারি এবং সন্ত্রাসী অর্থায়ন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। কোনো সেল দৃশ্যমান হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া সাফল্য নয়; সেল গড়ে ওঠার আগেই তার অর্থ, যোগাযোগ, নিয়োগ ও সরবরাহের পথ বন্ধ করতে পারাই হবে প্রকৃত সাফল্য।
বাংলাদেশ অতীতে জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু পরিবর্তিত কৌশলের জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় পুরোনো পদ্ধতিতে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। আজকের নীরব সেলই আগামী দিনের ভয়াবহ হামলার ভিত্তি হতে পারে। তাই সতর্কতা নয় শুধু-এখন প্রয়োজন আগাম প্রতিরোধ, গোয়েন্দা সমন্বয়, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বিত প্রয়োগ। বাংলাদেশের মাটিকে কোনো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের নিরাপদ আশ্রয়, অর্থসংস্থান বা বিস্তারের ক্ষেত্র হতে না দেওয়াই এখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
সানা/আপ্র/১৬/৮/২০২৬