জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করতে দেশে ফেরাতে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। এ অবস্থায় শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছে ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
রোববার এক প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শুধু ভারতের সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে না; বিষয়টি ভারতের বিচার বিভাগ ও আদালতের আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েও যেতে হবে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে ভারতের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত আদালতের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। বিষয়টি রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আদালতের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে যেসব অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো ভারতের আইনেও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত কি না, তা যাচাই করা হতে পারে।
অপর এক কর্মকর্তা জানান, শেখ হাসিনা চলতি বছরের ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তবে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধকে ঢাকা-দিল্লির সামগ্রিক কূটনৈতিক সম্পর্কের বাইরে দেখার সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
এর আগে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধ নির্ধারিত পদ্ধতি অনুযায়ী পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তা জানানো হবে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানান, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত বন্দি বিনিময় চুক্তির বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি নথিপত্র সংযুক্ত করেই শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ।
চুক্তি অনুযায়ী, কোনো অভিযুক্ত, দণ্ডিত ব্যক্তি কিংবা আদালতের সাজা কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যক্তিকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার বিধান রয়েছে। কোনো ব্যক্তি প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ করেছেন কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা রয়েছে।
তবে চুক্তির একটি ধারায় রাজনৈতিক প্রকৃতির অপরাধের ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে হত্যা, নরহত্যা, হামলা, আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার, অপহরণ, জিম্মি করা ও হত্যায় প্ররোচনার মতো বেশ কিছু অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করার কথাও চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া ভারতের ১৯৬২ সালের প্রত্যর্পণ আইনের বিধানও এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। ওই আইনের অধীনে প্রত্যর্পণসংক্রান্ত বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ নোডাল কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করে। প্রয়োজন মনে করলে মন্ত্রণালয় পুরো বিষয়টি তদন্তের জন্য একজন অনুসন্ধানী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করতে পারে।
অনুসন্ধান শেষে ম্যাজিস্ট্রেট যদি অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হস্তান্তরের উপযুক্ত মনে করেন, তাহলে প্রতিবেদনে তার প্রত্যর্পণের সুপারিশ করতে পারেন। অন্যদিকে, আবেদনকারী দেশের দাবির পক্ষে প্রাথমিকভাবে কোনো মামলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে মনে হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়ার সুপারিশও করা যেতে পারে।
ফলে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি ভারতের সংশ্লিষ্ট আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
এসি/আপ্র/১৬/০৮/২০২৬