চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তাকে সাময়িক ফলের ওঠানামা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার নেমে এসেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে, যা গত বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ২০ শতাংশ কম। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে ২২ হাজারের বেশি। প্রায় দুই দশকের ধারাবাহিকতায় এটি অন্যতম নিম্নতম ফল। তাই এবারের ফলাফল শুধু পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গভীরে জমে থাকা শিখনঘাটতি, বৈষম্য ও নীতিগত দুর্বলতার এক কঠিন সতর্কবার্তা।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, ‘মন খুলে গান গাওয়া যায়, নম্বর দেওয়া যায় না।’ এই বক্তব্যের তাৎপর্য অস্বীকার করা যায় না। পূর্ণ সিলেবাসে পরীক্ষা, কঠোর মূল্যায়ন, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ এবং উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের নতুন বিধান পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়িয়েছে। অতএব পাসের হার কমেছে মানেই শিক্ষা ধ্বংস হয়ে গেছে-এমন সরল সিদ্ধান্ত গ্রহণ যুক্তিসঙ্গত হবে না। বরং প্রকৃত প্রশ্ন হলো, এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন মৌলিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।
গণিত ও ইংরেজিতে দীর্ঘদিনের দুর্বলতা এবার আরো স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। এই দুটি বিষয় কেবল পরীক্ষার বিষয় নয়; উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি, গবেষণা এবং কর্মসংস্থানের ভিত্তি। মাধ্যমিক স্তরেই যদি শিক্ষার্থীরা এই ভিত্তি আয়ত্ত করতে ব্যর্থ হয়, তবে ভবিষ্যতের মানবসম্পদ উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা, কোচিংকেন্দ্রিক প্রস্তুতি, দুর্বল শ্রেণিকক্ষ পাঠদান, শিক্ষক সংকট এবং নিয়মিত মূল্যায়নের অভাব-এসব সমস্যার সমষ্টিগত প্রতিফলনই এবারের ফলাফল।
দাখিল ও কারিগরি শিক্ষার চিত্র আরো উদ্বেগজনক। মাদরাসা বোর্ডে পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ, আর শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২২৬। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডেও প্রায় ৪১ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা খাতের এই দুর্বলতা দেশের শিল্পোন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলও গভীর বৈষম্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এক বছরে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার থেকে নেমে এসেছে ৬৬৯-এ, আর শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান বেড়ে হয়েছে ৩১২। এটি স্পষ্ট করে যে সমস্যা কেবল শিক্ষার্থীর নয়; পাঠদানের মান, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, তদারকি এবং জবাবদিহির সঙ্গেও তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রবণতা হবে কৃত্রিমভাবে পাসের হার বাড়ানোর চেষ্টা করা। অতীতে সহজ মূল্যায়নের মাধ্যমে উচ্চ ফল দেখানোর সংস্কৃতি শিক্ষার প্রকৃত দুর্বলতাকে আড়াল করেছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ফল ভালো দেখানো নয়; শিক্ষার্থীকে সত্যিকার অর্থে শেখানো। কঠোর ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন যদি বাস্তব চিত্র সামনে আনে, তবে সেটিকে সংকট নয়, সংস্কারের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
এখন প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিগত পদক্ষেপ। প্রথমত, গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য জাতীয় পর্যায়ে প্রতিকারমূলক শিখন কর্মসূচি চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শূন্য পাস ও অতি নিম্ন পাসের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ নজরদারির আওতায় এনে শিক্ষক উপস্থিতি, পাঠদানের মান ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষায় আধুনিক পাঠক্রম, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, পরীক্ষাগার ও দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। চতুর্থত, অঞ্চলভিত্তিক শিখনঘাটতির তথ্যভিত্তিক মানচিত্র তৈরি করে লক্ষ্যভিত্তিক হস্তক্ষেপ নিতে হবে।
একটি পরীক্ষার ফল কখনো শুধু শিক্ষার্থীর ব্যর্থতার দলিল নয়; এটি পরিবার, শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ববোধের প্রতিচ্ছবি। এবারের এসএসসির ফল তাই হতাশার শেষ কথা নয়, বরং শিক্ষা সংস্কারের জন্য এক ঐতিহাসিক সতর্কসংকেত। এই সতর্কবার্তা যদি আমরা এখনো গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ না করি, তবে ভবিষ্যতে কেবল পাসের হার নয়, জাতির জ্ঞানভিত্তিক অগ্রযাত্রাই বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সানা/আপ্র/১২/৮/২০২৬