সাভারে সম্প্রতি একটি বাসায় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সদস্যদের বোমা তৈরির কার্যক্রম পরিচালনার চাঞ্চল্যকর তথ্য আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে এক গভীর ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সময়োপযোগী হস্তক্ষেপে একটি বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা ভেস্তে গেলেও এটি স্পষ্ট যে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো চুপিসারে তাদের নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের ভেতরে উগ্রবাদের কোমর ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে স্বস্তি প্রকাশ করা হলেও সাভারের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে আত্মঘাতী হামলা বা বড় ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টির সক্ষমতা অর্জনে জঙ্গিরা এখনো গোপনে তৎপর রয়েছে। এই ধরনের গোপন আস্তানা কেবল একটি নির্দিষ্ট এলাকাই নয়, বরং পুরো দেশের জননিরাপত্তার জন্য এক মারাত্মক অশনিসংকেত।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জঙ্গি উত্থানের পেছনে মূলত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ররোচনা এবং সাইবার দুনিয়ায় উগ্রবাদী মতাদর্শের নীরব প্রচার কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা নজরদারি ও সাঁড়াশি অভিযানের ফলে অতীতে জেএমবি, আনসার আল ইসলাম কিংবা নব্য জেএমবির মতো সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব বিপর্যস্ত হয়েছিল। তবে কিছুদিন ঝিমিয়ে থাকার পর তারা এখন ছোট ছোট মডিউলে বিভক্ত হয়ে আত্মগোপনে থেকে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার কৌশল নিয়েছে। স্থানীয় বাড়িভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়ির মালিকদের অসচেতনতা এবং সঠিক পরিচয়পত্র যাচাই না করার প্রবণতা এই অপরাধীদের সহজেই গা ঢাকা দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। ফলে উগ্রবাদীরা নতুন কর্মী সংগ্রহ এবং বিস্ফোরক সংগ্রহের মতো ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে- যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার পথে এক বিরাট অন্তরায়।
বলা বাহুল্য, উদীয়মান জঙ্গি তৎপরতার সংকট মোকাবিলায় কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করলেই চলবে না; বরং একটি সমন্বিত সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। প্রথমত, বাড়িভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশি ভেরিফিকেশন এবং কঠোর নিয়মকানুন নিশ্চিত করতে হবে যাতে কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তি সহজেই আশ্রয় না পায়। দ্বিতীয়ত, মসজিদ, মাদরাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় পর্যায়ে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে তরুণ সমাজকে উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সচেতন করে তুলতে হবে। এছাড়া গোয়েন্দা নেটওয়ার্ককে আরও আধুনিক ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর করে অপরাধীদের শিকড় গভীরে যাওয়ার আগেই তা উপড়ে ফেলতে হবে। রাষ্ট্র ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই অপশক্তিকে রুখে দিয়ে বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ ও শান্তির জনপদ হিসেবে টিকিয়ে রাখা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। তাই আমাদের প্রত্যাশা, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির নতুন করে নৈরাজ্য সৃষ্টির অপতৎপরতা বন্ধে দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ প্রয়োজন নেবে সরকার।
কেএমএএ/আপ্র/১৩.০৮.২০২৬