রাষ্ট্রের সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড শুধু উন্নত অবকাঠামো নির্মাণে নয়; মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ, সহজ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বস্তিদায়ক হয়েছে, তার মধ্যেই উন্নয়নের আসল প্রতিফলন। এই বিবেচনায় শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দুটি কর্মসূচি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। একটি দেশের স্নায়ুরোগ চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ, অন্যটি দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও ভোগান্তির অবসান ঘটিয়ে অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রাপ্য অর্থ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা। ক্ষেত্র দুটি ভিন্ন হলেও উভয় উদ্যোগেই ফুটে উঠেছে মানুষের প্রয়োজনকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে রাখার প্রত্যয়।
আগারগাঁওয়ের জাতীয় নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের পাঁচশ শয্যার নতুন ইউনিটের উদ্বোধন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নিঃসন্দেহে আশার আলো জ্বালিয়েছে। ২০১২ সালে তিনশ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় পরে আরো দুইশ শয্যা যুক্ত করে। তাতেও চাহিদা পূরণ না হওয়ায় নতুন পাঁচশ শয্যার ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এখন হাসপাতালটির মোট শয্যা এক হাজারে উন্নীত হওয়া স্নায়ুরোগ ও স্নায়ুশল্য চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা তৈরি করবে। বিশেষ করে দেশের মানুষের জন্য জটিল স্নায়ুরোগের চিকিৎসা আরো সহজলভ্য হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
কিন্তু ভবন নির্মাণই চিকিৎসাসেবার শেষ কথা নয়। নতুন শয্যার সঙ্গে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, কারিগরি জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় অর্থ নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অনেক বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান জনবল, সরঞ্জাম ও প্রশাসনিক জটিলতায় পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হয়নি। নতুন ইউনিটের ক্ষেত্রেও যেন সেই পুরোনো চিত্র ফিরে না আসে, সে বিষয়ে এখনই কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন। রাজধানীর বাইরে উন্নত চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণও সমান জরুরি। প্রধানমন্ত্রী যে স্বাস্থ্যসেবাকে বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলেছেন, তা বাস্তবায়িত হলে চিকিৎসার জন্য ঢাকামুখী মানুষের চাপ কমবে এবং চিকিৎসার বৈষম্যও হ্রাস পাবে।
অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য সরকারের উদ্যোগটি মানবিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় বহন করে। ২০২২ সালের পর অর্থপ্রাপ্তিতে অনিশ্চয়তায় থাকা ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-শিক্ষিকাকে দুই হাজার ৩৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে তাঁদের পাওনার একটি অংশ পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। যাঁরা সারা জীবন প্রজন্মকে নীতি, নৈতিকতা ও আদর্শের শিক্ষা দিয়েছেন, তাঁদের নিজেদের প্রাপ্য অর্থের জন্য দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হবে কিংবা হয়রানির শিকার হতে হবে-এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তাই অনলাইনে সরাসরি ব্যাংক হিসাবে অবসরসুবিধার অর্থ পৌঁছে দেওয়ার প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি শুধু ভোগান্তি কমাবে না, মধ্যস্বত্বভোগী ও অনিয়মের সুযোগও সংকুচিত করবে। তবে সাময়িক অর্থছাড়ের পাশাপাশি কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধা বোর্ডের আর্থিক ভিত্তি স্থায়ীভাবে শক্তিশালী করতে হবে। ভবিষ্যতে যেন কোনো শিক্ষককে তাঁর ন্যায্য পাওনার জন্য অপেক্ষা করতে না হয়, সেই নিশ্চয়তা গড়ে তুলতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষককল্যাণ-দুটি ক্ষেত্রেই শনিবারের উদ্যোগ মানুষের প্রত্যাশায় নতুন আলো জ্বালিয়েছে। এখন প্রয়োজন ঘোষণাকে কার্যকর বাস্তবতায় রূপ দেওয়া। হাসপাতালের নতুন শয্যা রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করবে, আর শিক্ষকের প্রাপ্য অর্থ পৌঁছাবে নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ ব্যবস্থায়-এটাই হোক রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের চূড়ান্ত সাফল্য। কারণ রাষ্ট্রের মানবিকতা ঘোষণায় নয়, মানুষের জীবনে তার বাস্তব সুফল কতটা পৌঁছেছে, তার মধ্যেই প্রমাণিত হয়।
সানা/আপ্র/১৭/৮/২০২৬