বিশ্বজুড়ে মানুষের গড় আয়ু আবারো বাড়ছে। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে যে ধাক্কা লেগেছিল, তা অনেকটাই কাটিয়ে উঠে বৈশ্বিক গড় আয়ু মহামারিপূর্ব অবস্থার প্রায় কাছাকাছি ফিরেছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।
২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল ও দেশে মৃত্যু এবং প্রতিবন্ধিতার প্রবণতা বিশ্লেষণ করে এ হিসাব তৈরি করা হয়েছে। এতে জাতীয় পর্যায়ের জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনসহ বিভিন্ন তথ্য, ডব্লিউএইচওর কারিগরি কর্মসূচির হিসাব এবং জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থাগুলোর তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
জাতিসংঘের স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থাটির সর্বশেষ বৈশ্বিক স্বাস্থ্য হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বে মানুষের গড় আয়ু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩ দশমিক ৩ বছর। ২০১৯ সালে এ হার ছিল ৭৩ দশমিক ৪ বছর। অর্থাৎ মহামারির আগের অবস্থার তুলনায় গড় আয়ু এখন মাত্র শূন্য দশমিক ১ বছর কম।
তবে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সময় তুলনামূলক ধীরগতিতে পুনরুদ্ধার হয়েছে। ২০২৩ সালে মানুষ গড়ে ৬২ দশমিক ৮ বছর সুস্থভাবে বেঁচেছে, যা ২০১৯ সালের তুলনায় এখনো শূন্য দশমিক ৪ বছর কম।
ডব্লিউএইচওর ডেটা, ডিজিটাল স্বাস্থ্য, বিশ্লেষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিভাগের পরিচালক ড. অ্যালাঁ ল্যাব্রিক বলেন, ‘দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় অর্জন।’
তিনি বলেন, ‘পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের জীবনে যুক্ত হওয়া অতিরিক্ত বছরগুলো যেন সুস্থভাবে কাটে। একই সঙ্গে জনসংখ্যার পরিবর্তিত চাহিদা মোকাবিলায় স্বাস্থ্যব্যবস্থাগুলোও যেন প্রস্তুত থাকে।’
নিম্নআয়ের দেশেও বদলাচ্ছে মৃত্যুর ধরন: বিশ্বে মানুষ কী কারণে মারা যাচ্ছে, সেই প্রবণতায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিয়েছে ডব্লিউএইচও।
২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো নিম্নআয়ের দেশগুলোতে মোট মৃত্যুর অর্ধেকেরও কম হয়েছে সংক্রামক রোগে। অর্থাৎ এক ব্যক্তি বা প্রাণী থেকে অন্য ব্যক্তি কিংবা কোনো পৃষ্ঠের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া রোগের কারণে মৃত্যুর হার অর্ধেকের নিচে নেমেছে। ডব্লিউএইচওর ভাষায়, এটি রোগের ধরন ও মৃত্যুর কারণের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে মোট মৃত্যুর ৭৪ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল অসংক্রামক রোগ। ২০০০ সালে এ হার ছিল ৫৮ শতাংশ। বিশ্বের মৃত্যুর প্রধান ১০টি কারণের মধ্যে আটটিই ছিল অসংক্রামক রোগ।
হৃদ্রোগ এখনো মৃত্যুর প্রধান কারণ: হৃদ্রোগ এখনো বিশ্বে মৃত্যুর প্রধান কারণ এবং রোগজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্যতম বড় উৎস। শুধু ইস্কেমিক হৃদ্রোগে ২০২৩ সালে আনুমানিক ৯৫ লাখ মানুষ মারা গেছে। এ রোগের কারণে বিশ্বে মানুষের সুস্থ জীবনের প্রায় ২১ কোটি বছর হারিয়েছে।
২০০০ সালের পর বিশ্বের অনেক অঞ্চলে হৃদ্রোগের বোঝা কমাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ব্যক্তিপ্রতি ঝুঁকি বেড়েছে। এতে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবায় বিদ্যমান বৈষম্যও স্পষ্ট হয়েছে।
দ্রুত বাড়ছে ডিমেনশিয়ার বোঝা: অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগও ক্রমেই বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে উঠছে। ২০০০ সালে বিশ্বে মৃত্যুর ১৯তম প্রধান কারণ ছিল ডিমেনশিয়া। ২০২৩ সালে তা পঞ্চম অবস্থানে উঠে এসেছে। এ সময়ে ডিমেনশিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে।
২০০০ সালের পর ডায়াবেটিসে মৃত্যুর ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ বৃদ্ধির মাত্রা বেশি।
২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বয়সের পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া বৈশ্বিক হিসাবে, বিষণ্নতাজনিত রোগের কারণে হারানো সুস্থ জীবনের হার প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। উদ্বেগজনিত রোগের ক্ষেত্রে এ বৃদ্ধি ছিল প্রায় ৪৫ শতাংশ।
মাদক ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট রোগের ক্ষেত্রে ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মৃত্যুঝুঁকি এবং সুস্থ জীবন হারানোর হার সবচেয়ে বেশি বেড়েছে আমেরিকা মহাদেশে। বিপরীতে, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এ ধরনের ঝুঁকিতে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে।
ড. ল্যাব্রিক বলেন, ‘এসব হিসাবের মূল্য শুধু সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।’ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও সময়ে মৃত্যুর কারণ এবং রোগের বোঝা কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, তা তুলে ধরার মাধ্যমে এসব তথ্য দেশগুলোকে স্বাস্থ্যনীতি ও অগ্রাধিকার নির্ধারণে প্রয়োজনীয় প্রমাণ সরবরাহ করে বলেও জানান তিনি।
মানুষের দীর্ঘায়ু জনস্বাস্থ্যের অগ্রগতির বড় অর্জন হলেও বাড়তি বছরগুলো কতটা সুস্থভাবে কাটছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বার্ধক্য, ডিমেনশিয়া, হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, বিষণ্নতা ও উদ্বেগের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের বাড়তি চাপ সামলাতে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রস্তুত করাই আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ।
সানা/ডিসি/আপ্র/৩/১০/২০২৬