শাকিল কবির
নদী শুধু একটি জলধারা নয়। নদী একটি জনপদের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক অনিবার্য বাস্তবতা। নদীর কলকল শব্দে মিশে থাকে মানুষের শৈশবের স্মৃতি, কৃষকের স্বপ্ন, জেলের জীবিকা, নৌচলাচল এবং একটি জনপদের দীর্ঘ ইতিহাস। নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে আমাদের বহু জনপদ, কৃষি, অর্থনীতি, জীবনযাত্রা, ঐতিহ্য ও সভ্যতা।
নদীর গুরুত্ব, স্বাভাবিক প্রবাহ এবং নদী রক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে ভাবার দিন এটি। বাংলাদেশে সরকারি তালিকায় ১ হাজার ৪১৫টি নদী চিহ্নিত হয়েছে। কিন্তু নদীর সংখ্যা জানাই যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হলো, এসব নদীর কতগুলো আজ জীবন্ত, প্রবহমান ও নিরাপদ? সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য ও গবেষণা বলছে, দখল, দূষণ, পলি জমা, নাব্যতা হ্রাস, অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও প্রবাহের পরিবর্তনে দেশের বহু নদী গভীর সংকটে রয়েছে। এই সংকটের চেহারা নদীভেদে ভিন্ন।
তিস্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আন্তঃসীমান্ত নদীর প্রবাহ ও পানির ন্যায্য ব্যবস্থাপনার কথা। যমুনা ও পদ্মা দেখায় নদীভাঙনের নির্মম বাস্তবতা। সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত পাঁচ দশকে যমুনা, গঙ্গা ও পদ্মার সম্মিলিত ভাঙনে বাংলাদেশ প্রায় ১ হাজার ৫৮৫ বর্গকিলোমিটার ভূমি হারিয়েছে। একই সময়ে প্রায় ৪৩৩ বর্গকিলোমিটার চর জেগে উঠলেও নিট ভূমি ক্ষতি প্রায় ১ হাজার ১৫৩ বর্গকিলোমিটার। এই ভাঙনের সঙ্গে হারিয়েছে মানুষের বসতবাড়ি, কৃষিজমি, প্রতিষ্ঠান ও বহু বছরের স্মৃতি। মেঘনা, সুরমা ও কুশিয়ারা দেশের বিশাল জলব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব নদীর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে হাওর, জলাভূমি, মৎস্যসম্পদ, কৃষি ও মানুষের জীবন-জীবিকা।
অন্যদিকে কর্ণফুলী চট্টগ্রাম অঞ্চলের অর্থনীতি, নৌপরিবহন ও জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। অর্থাৎ উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম- নদী বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও মানুষের জীবনকে একটি অদৃশ্য সুতায় বেঁধে রেখেছে। বাংলাদেশের প্রধান নদী ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, গঙ্গা-পদ্মা, সুরমা-মেঘনা এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের নদী ব্যবস্থা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর সংকট আরও দৃশ্যমান। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও ধলেশ্বরী নিয়ে ২০২৬ সালের বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি মূল্যায়নে বুড়িগঙ্গাকে পৎরঃরপধষষু বহফধহমবৎবফ, তুরাগকে বহফধহমবৎবফ ওং ধলেশ্বরীকে যরমযষু াঁষহবৎধনষব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শিল্পবর্জ্য, অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য, প্লাস্টিক, বাজারের বর্জ্য, নদী দখল, অবৈধ স্থাপনা, পলি জমা ও সংকুচিত প্রবাহপথকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বুড়িগঙ্গার সংকট যে শুধু চোখে দেখা দূষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সাম্প্রতিক গবেষণায়ও তা উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় নদীর পানি ও তলানিতে ক্রোমিয়াম, নিকেল, তামা, সীসা, ক্যাডমিয়ামসহ বিভিন্ন ভারী ধাতুর দূষণ শনাক্ত হয়েছে। শিল্প ও নগর বর্জ্যের প্রভাবে নদীর নিম্নপ্রবাহে দূষণের চাপ এবং পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টিও গবেষণায় উঠে এসেছে।
ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যার ক্ষেত্রেও শিল্প ও নগর বর্জ্যের চাপ দীর্ঘদিনের। সাভারের ট্যানারি শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন শিল্প ও নগর বর্জ্যের প্রভাব এসব নদীর ওপর পড়ছে। ফলে নদী রক্ষা এখন শুধু দখলমুক্ত করার প্রশ্ন নয়, দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনারও প্রশ্ন। তাহলে প্রশ্ন হলো, তিস্তা, পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী কিংবা শীতলক্ষ্যার সংকট কি আলাদা আলাদা?
আসলে নদীকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায় না। একটি নদীর সঙ্গে তার শাখা-প্রশাখা, খাল, বিল, জলাভূমি, প্লাবনভূমি, ভূগর্ভস্থ পানি ও আশপাশের প্রকৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই নদী রক্ষার অর্থ শুধু নদীর দুই তীর রক্ষা করা নয়, বরং পুরো নদী অববাহিকাকে একটি সমন্বিত পরিবেশব্যবস্থা হিসেবে দেখা। এ জায়গাতেই বন ও নদীর সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ। বন পানি ধারণে সহায়তা করে, মাটি ও জলাধারকে সুরক্ষা দেয় এবং স্থানীয় জলপ্রবাহের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। নদী আবার পানি, পুষ্টি ও জীবনের প্রবাহ বহন করে।
ঘড় ঋড়ৎবংঃং, ঘড় জরাবৎং, ঘড় ডধঃবৎ, ঘড় খরভব শুধু একটি স্লোগান নয়; প্রকৃতি ও মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতার একটি সহজ সত্য। বাংলাদেশের নদীর ভবিষ্যৎ শুধু দেশের সীমানার মধ্যেই নির্ধারিত হয় না। সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশে ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদী রয়েছে, যার ৫৪টি ভারতের সঙ্গে এবং ৩টি মিয়ানমারের সঙ্গে অভিন্ন। ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পানির প্রাপ্যতা, তথ্যের আদান-প্রদান এবং অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনায় আন্তদেশীয় সহযোগিতার গুরুত্বও রয়েছে।
আমরা উন্নয়ন চাই, শিল্প চাই, নগরায়ণ চাই। কিন্তু উন্নয়ন যদি নদীর প্রবাহ বন্ধ করে, জলাভূমি ভরাট করে কিংবা পানির স্বাভাবিক পথ সংকুচিত করে, তাহলে তার দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রকৃতি ও উন্নয়নকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ না বানিয়ে প্রকৃতিকে সুরক্ষিত রেখেই উন্নয়নের পথ খুঁজতে হবে।
ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদ এই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একসময় ব্রহ্মপুত্রকে ঘিরে ময়মনসিংহ অঞ্চলের অর্থনীতি, যোগাযোগ ও সংস্কৃতির বিস্তার ঘটেছিল। কিন্তু পলি জমা, দখল ও অন্যান্য মানবসৃষ্ট চাপের কারণে এর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নাব্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সাম্প্রতিক স্থানীয় গবেষণা ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বৃহত্তর এই নদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য নদীও আজ নানা সংকটে রয়েছে। তাই নদী রক্ষা শুধু পরিবেশকর্মীদের দায়িত্ব নয়। এটি কৃষকের স্বার্থের প্রশ্ন, জেলের জীবিকার প্রশ্ন, নগরের নিরাপত্তার প্রশ্ন, নিরাপদ পানির প্রশ্ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার।
নদীকে শুধু পানি বহনকারী একটি জলপথ হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত পরিবেশব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে। দখল ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নদীর সীমানা ও প্রবাহপথ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি এবং নদী অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি। তাই আমাদের নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখা দরকার- আমরা কেমন নদী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে চাই? এমন একটি নদী- যার অস্তিত্ব শুধু মানচিত্রে থাকবে; নাকি এমন একটি নদী- যার বুকে পানি থাকবে, তীরে সবুজ থাকবে; যেখানে মাছ থাকবে, পাখি থাকবে, মানুষ থাকবে এবং নদী তার নিজস্ব গতিতে বয়ে যাবে?
জল রবে নদীতে, নদী রবে বাংলার বুকে। নদী বাঁচলে শুধু নদী বাঁচবে না; বাঁচবে পানি, প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, মানুষের জীবন ও আমাদের ভবিষ্যৎ।
লেখক: পরিবেশ ও উন্নয়নকর্মী
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/২৫.০৯.২০২৬