একেএম ফজলুল হক: বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং। কথায় কথায় মারামারি, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, ছিনতাই, দখলবাজি, অপহরণ, খুনসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোরালো অভিযান চললেও থামছে না তাদের অপতৎপরতা। স্কুল-কলেজ এলাকা থেকে পাড়া-মহল্লা, খেলার মাঠ, পার্ক ও খোলা জায়গা-সর্বত্রই রয়েছে তাদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে চট্টগ্রাম জেলার ১৭টি থানা এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৪৪৫ জনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫৪ জন কিশোরকে থানায় এনে যাচাই-বাছাই করা হয়। অপরাধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না পাওয়ায় ২৯৩ জনকে অভিভাবকদের জিম্মায় মুচলেকার মাধ্যমে হস্তান্তর করা হয়। অপরাধে সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় ১৫২ জনের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অভিযান পরিচালনা করা হয় পাড়া-মহল্লা, বাজার, রেলস্টেশন, মাঠ, পরিত্যক্ত ও নির্জন স্থানসহ কিশোরদের আড্ডার সম্ভাব্য এলাকাগুলোতে। অভিযানের পর অভিভাবকদের থানায় ডেকে সন্তানদের চলাফেরা, বন্ধু-বান্ধব, পড়াশোনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
তবে পুলিশের অভিযান সত্ত্বেও সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতার চিত্র সামনে এসেছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর খুলশী থানার ওয়্যারলেস কলোনির তালতলা এলাকায় মো. হৃদয় (১৬) নামে এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, কিশোর গ্যাংয়ের দুই পক্ষের বিরোধের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ ঘটনায় কামরুলসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত হৃদয় একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ছিল এবং হামলাকারীরা অন্য একটি গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত।
এ ঘটনায় মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা ওয়াকিল হোসেন বগার নামও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেভেন স্টার নামের একটি কিশোর গ্যাং পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে তার ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এদিকে নতুন নতুন দল তৈরি করে কিশোরদের অপরাধে জড়ানোর পেছনে এক শ্রেণির অভিভাবকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্মতির বিষয়টিও পুলিশ জানতে পেরেছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও আশপাশের এলাকায় এমন ঘটনা প্রকটভাবে দেখা গেছে। দীর্ঘদিনের বিরোধে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা কিংবা এলাকায় প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে কিছু অভিভাবক নিজেদের সন্তানকে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত করছেন বলেও জানান তিনি।
পুলিশের ভাষ্য, শুধু অভিভাবকদের প্রশ্রয় নয়, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়াও কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, চুরি, ছিনতাই, মাদক, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব অপরাধী গোষ্ঠীর নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
খুলশীর অপরূপা হাউজিং সোসাইটির বাসিন্দা ও হোটেল কুসুমের মালিক মো. ফারুক সিকদারও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগে তিনি মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের ইভটিজিং ও দখলবাজির অভিযোগ তুলে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছেন। অভিযোগকারীর ভাষ্য, ৩০ সেপ্টেম্বর রাত দেড়টার দিকে গরীব উল্লাহ শাহর মাজার প্রাঙ্গণে একটি ছেলেকে দলবদ্ধভাবে মারধরের ঘটনা দেখে তিনি স্থানীয় কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য পাঠান।
ফারুক সিকদারের অভিযোগ, এ ঘটনায় অভিযুক্তরা তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে গালাগাল ও মারধরের চেষ্টা করে এবং মাজার প্রাঙ্গণ ও আশপাশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজিতে বাধা দিলে হত্যার হুমকি দেয়। তার অভিযোগ, মার্কেটের পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং মাজারের প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো একটি ডেক বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, নগর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা কমাতে টহলের পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে। উচ্চবিদ্যালয়গুলোতে গিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নিয়ে সমাবেশ করা হচ্ছে। পুলিশ বলছে, কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান নয়, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি এবং সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। এ ধরনের বিশেষ অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
সানা/আপ্র/৪/১০/২০২৬