অন্তর্জালজগতের অপরাধ দমন, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের বিস্তার রোধে একটি কার্যকর আইন নিঃসন্দেহে সময়ের দাবি। কিন্তু সেই আইন যদি নিরাপত্তার পরিবর্তে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে, অপরাধ দমনের পাশাপাশি সংবাদ প্রকাশ, মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকেও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য সুরক্ষার চেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। প্রস্তাবিত অন্তর্জাল নিরাপত্তা আইন, ২০২৬-এর সংশোধনী নিয়ে গণমাধ্যমের অংশীজনদের সাম্প্রতিক উদ্বেগ তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।
সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত পরামর্শ সভায় গণমাধ্যমের শীর্ষ ব্যক্তিরা আইনের কয়েকটি বিধানের অপপ্রয়োগের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর বক্তব্য - প্রয়োজনীয় সংশোধন ছাড়া আইনটি পাস হলে বাংলাদেশ বৃহৎ কারাগারে পরিণত হবে - নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর ভেতরে রয়েছে একটি মৌলিক সতর্কবার্তা। কোনো আইনের ভাষা যদি অস্পষ্ট হয়, প্রয়োগের সীমা যদি নির্দিষ্ট না থাকে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর কার্যকর রক্ষাকবচ না থাকে, তবে ভালো উদ্দেশ্যে প্রণীত আইনও একসময় নাগরিক স্বাধীনতার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
অবশ্য সরকারের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করেছেন, গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে আইনটি করা হয়নি এবং কোনো সাংবাদিক যাতে অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, সরকার তা চায় না। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের আগে আদালতের অনুমতির প্রস্তাব, আপিল নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামত গ্রহণ এবং সংশোধিত খসড়া জনগণের সামনে প্রকাশের ঘোষণা ইতিবাচক উদ্যোগ। একই সঙ্গে সংসদে বিলটি তাড়াহুড়া করে পাস না করার আশ্বাসও প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
তবে আশ্বাস যথেষ্ট নয়; আইনের কাঠামোর মধ্যেই তার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় আলাদা ও সুস্পষ্ট সুরক্ষা বিধান থাকতে হবে। সাংবাদিকতা ও অপরাধের সংজ্ঞা পরিষ্কার করতে হবে, যাতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, সমালোচনামূলক মতামত বা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকাশনা অনিচ্ছাকৃতভাবে অপরাধের আওতায় না পড়ে। গণমাধ্যম-সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তিতে স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশনের মতো একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাবও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সরকার সাত থেকে পনের দিনের মধ্যে সুপারিশ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এই সময়কে আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে না দেখে প্রকৃত অংশগ্রহণমূলক আইন প্রণয়নের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। সম্পাদক পরিষদ, সংবাদপত্র, বৈদ্যুতিন ও অনলাইন গণমাধ্যম, আইনজ্ঞ এবং অন্তর্জাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতামত সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। সংশোধিত খসড়া প্রকাশের পরও জনমত গ্রহণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কার্যকর করতে হবে।
রাষ্ট্রের শক্তি কেবল কঠোর আইনে নয়, ন্যায়সংগত আইনের প্রয়োগে। নাগরিককে অপরাধীর হাত থেকে যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সম্ভাব্য অপব্যবহার থেকেও রক্ষা করতে হবে। অন্তর্জাল নিরাপত্তার নামে যেন সংবাদপত্রের কণ্ঠ রুদ্ধ না হয়, আবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আড়ালে প্রকৃত অপরাধও যেন ছাড় না পায়। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যই হবে নতুন আইনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। নিরাপদ রাষ্ট্র চাই, কিন্তু সেই নিরাপত্তা যেন স্বাধীনতার মূল্য দিয়ে অর্জিত না হয়।
সানা/আপ্র/৩০/০৯/২০২৬