একেএম ফজলুল হক: ফেনসিডিলের বিকল্প হিসেবে ভারত থেকে কোডিনযুক্ত ‘ফেয়ারডিল’ নামের কাশির সিরাপ চোরাইপথে বাংলাদেশে ঢুকছে বলে জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সম্প্রতি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে প্রথমবারের মতো ১০০ বোতল ফেয়ারডিল জব্দ করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, দ্রুত এ সিরাপ সহজলভ্য হয়ে উঠলে দেশের মাদকের বাজারে নতুন করে বিস্তার লাভ করতে পারে।
সেবনকারীদের কাছে ফেনসিডিলের দীর্ঘদিনের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে মাদক কারবারিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে কৌশল বদলাচ্ছে। ভারতের সীমান্তসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় তৈরি কোডিনযুক্ত সিরাপ ভিন্ন ভিন্ন নামে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফেনসিডিলের তুলনায় এসব সিরাপের দাম কম হওয়ায় মাদকাসক্তদের একটি অংশও সেদিকে ঝুঁকছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফেনসিডিলের মতো দেখতে বিভিন্ন ধরনের কোডিনযুক্ত সিরাপ দেশে প্রবেশ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে পড়লে কারবারিরা নাম ও মোড়ক পরিবর্তন করছে। বর্তমানে সীমান্তপথে ফেয়ারডিল, উইন কোরেক্স, ব্রনোকফ সি ও চকো প্লাসসহ বিভিন্ন নামে কোডিনযুক্ত সিরাপ ঢোকার তথ্য পাওয়া গেছে।
মিরসরাইয়ে প্রথম চালান জব্দ: গত শনিবার ১৫ আগস্ট রাতে মিরসরাই থানা-পুলিশ ১০০ বোতল ফেয়ারডিল জব্দ করে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে জব্দ হওয়া ফেয়ারডিলের এটিই প্রথম চালান।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ফেনসিডিলের বিকল্প হিসেবে ফেয়ারডিলের ব্যবহার শুরু হয়েছে। সীমান্তঘেঁষা ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর এ সিরাপ বাংলাদেশে ঢুকছে। এখনো এর বিস্তার বড় আকার ধারণ না করলেও ক্রমেই এটি সহজলভ্য হয়ে উঠছে।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, মিরসরাইয়ে ১০০ বোতল ফেয়ারডিল উদ্ধার হয়েছে। চট্টগ্রামে এর আগে এ সিরাপ উদ্ধার হয়েছে বলে তাঁদের জানা নেই। নতুন এ মাদক কোথা থেকে, কীভাবে এবং কার মাধ্যমে চট্টগ্রামে আসছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
ফেনসিডিলের মতোই কোডিনযুক্ত: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক হুমায়ুন কবীর খোন্দকার বলেন, ফেনসিডিল, ফেয়ারডিলসহ আরো কয়েক ধরনের কফ সিরাপ রয়েছে, যেগুলো মূলত একই ধরনের। ফেনসিডিল একটি পরিচিত ব্র্যান্ডে পরিণত হওয়ায় এ নামটিই বেশি প্রচলিত। এসব সিরাপেই ক্ষতিকর কোডিন ফসফেট থাকে।
তাঁর তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত ১০০ মিলিগ্রাম সিরাপে ১০ মিলিগ্রাম কোডিন ফসফেট থাকে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগরের উপপরিচালক মোহাম্মদ মানজুরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে কোডিনভিত্তিক সিরাপ নিষিদ্ধ মাদক হিসেবে গণ্য। ফলে দেশে ফেয়ারডিলের মতো সিরাপ উৎপাদনের সুযোগ নেই।
তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন ভারতের কিছু এলাকায় ছোট ছোট ‘কিচেন ল্যাব’ বা মাদক কারখানায় কোডিন ফসফেট মিশ্রিত সিরাপ তৈরি হওয়ার তথ্য তাঁরা পেয়েছেন। সীমান্তে বিক্রির পর চোরাকারবারিরা সেগুলো বাংলাদেশে নিয়ে আসছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার এবং মিয়ানমারের সঙ্গে ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। উভয় সীমান্ত দিয়েই বিভিন্ন ধরনের মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করে বলে জানান তিনি।
নাম বদলে নতুন বাজারের চেষ্টা: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ধারণা, ফেনসিডিলের পরিচিতির কারণে এ মাদকের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি রয়েছে। পাশাপাশি ফেনসিডিলের দাম বেশি হওয়ায় এর বিকল্প হিসেবে নতুন বাজার তৈরির চেষ্টা করছে কারবারিরা।
এ ক্ষেত্রে একই ধরনের সিরাপের বোতলে ভিন্ন নামের মোড়ক লাগিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মানজুরুল ইসলাম বলেন, ভারতে কোডিন ফসফেট মিশ্রিত কিছু সিরাপ বৈধ পণ্য হিসেবে বাজারজাত হয়। তবে বাংলাদেশে পাওয়া ফেয়ারডিল বা অন্য এসব কাশির সিরাপ শুধু ভারত থেকেই আসছে বলে তাঁদের কাছে তথ্য রয়েছে। ফেয়ারডিল ভারতের বৈধ কোনো কারখানায় উৎপাদিত হয় কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সীমান্তের কিচেন ল্যাবে তৈরি সিরাপ বিভিন্ন নামে লেবেল লাগিয়ে পাচার করা হয়ে থাকতে পারে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মক: জনস্বাস্থ্য গবেষক ডা. এ কে এম আরিফ উদ্দিন আহমেদ বলেন, অনিয়ন্ত্রিতভাবে কফ সিরাপ সেবনে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া, লিভার ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে দেশের সীমান্তসংলগ্ন ৩২টি জেলাকে মাদক পাচারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এতে ভারতের আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম ও দক্ষিণ দিনাজপুরের বিভিন্ন সীমান্তপথ দিয়ে সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, ফেনী ও নওগাঁয় ফেনসিডিল প্রবেশের তথ্য উল্লেখ করা হয়।
তবে ভারত সীমান্তের ৫০ কিলোমিটার এলাকায় ফেনসিডিল এবং এটি তৈরির উপকরণ সরবরাহ, বহন ও উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এরপরও নাম ও মোড়ক বদলে কোডিনযুক্ত নতুন ধরনের সিরাপ বাংলাদেশে ঢুকতে থাকায় মাদক নিয়ন্ত্রণে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
সানা/আপ্র/২০/৮/২০২৬