বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতিসংঘ শিশু তহবিলের যৌথ মনিটরিং কর্মসূচির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর পানি, স্যানিটেশন, হাত ধোয়ার সুবিধা, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। দক্ষিণ এশিয়ার তুলনামূলক তথ্য থাকা দেশগুলোর মধ্যে চারটি সূচকেই বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে দুর্বল সারিতে।
‘প্রোগ্রেস অন ওয়াটার, স্যানিটেশন, হাইজিন, এনভায়রনমেন্টাল ক্লিনিং অ্যান্ড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ইন হেলথ কেয়ার ফ্যাসিলিটিজ ২০১৫-২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) প্রকাশ করা হয়। এতে বিশ্বের শতাধিক দেশের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৭১ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক পানি সেবা রয়েছে। ১৮ শতাংশে সীমিত সেবা এবং ১১ শতাংশে কোনো পানি সেবাই নেই। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানে মৌলিক পানি সেবার হার ৭৫ শতাংশ। আর ভারত ও ভুটানে ৯৭ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৯৬ শতাংশ, ইরানে ৮৮ শতাংশ, নেপালে ৮৩ শতাংশ এবং আফগানিস্তানে ৮২ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক পানি সেবা রয়েছে। মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় এ সেবার গড় হার ৮৯ শতাংশ।
স্যানিটেশন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের চিত্র আরো নাজুক। দেশের মাত্র ২৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক স্যানিটেশন সেবা রয়েছে। ৫৭ শতাংশে সীমিত সেবা এবং ১৮ শতাংশে কোনো সেবাই নেই। ২০২২ সালের স্বাস্থ্যসেবা জরিপের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১৯ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র পয়োনিষ্কাশন লাইনের সঙ্গে যুক্ত। ৫৬ শতাংশ সেপটিক ট্যাংক এবং ১১ শতাংশ পিট ল্যাট্রিনের ওপর নির্ভরশীল।
হাত ধোয়ার সুবিধাসহ মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি সেবা রয়েছে মাত্র ৩২ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। ৪০ শতাংশে সীমিত এবং ২৭ শতাংশে কোনো সেবাই নেই। বিপরীতে ভারত, ইরান, শ্রীলঙ্কা ও ভুটানে এ হার যথাক্রমে ৯৪, ৯৩, ৯২ ও ৮৫ শতাংশ।
পরিবেশ পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের মাত্র ২০ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক সেবা রয়েছে। ৩১ শতাংশে সীমিত সেবা এবং ৪৯ শতাংশে কোনো সেবাই নেই। এ ক্ষেত্রে ভারত ও শ্রীলঙ্কার মৌলিক সেবার হার যথাক্রমে ৭৮ ও ৫৭ শতাংশ।
স্বাস্থ্যসেবা বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল। মাত্র ১৬ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা রয়েছে। ৫৫ শতাংশে সীমিত এবং ২৮ শতাংশে কোনো ব্যবস্থাপনাই নেই। প্রতিবেদনে তথ্য থাকা ১৬টি দেশের মধ্যে মৌলিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয় সর্বনিম্ন।
২০১৮ সালের একটি জরিপের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কোনো নন-হাসপাতাল স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই সুচালো বর্জ্য ধ্বংসে ইনসিনারেটর ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়নি। এতে সংক্রামক বর্জ্য নিরাপদে ধ্বংস করার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়।
প্রতিবেদনে কক্সবাজারকে অঞ্চলভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজের একটি চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্বব্যাপীও পরিস্থিতি পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি ১০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের একটি স্যানিটেশন সেবাবিহীন। এতে প্রায় ৯৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। বৈশ্বিকভাবে মাত্র ৪০ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র মৌলিক স্যানিটেশন সেবার সব শর্ত পূরণ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পানি, স্যানিটেশন, হাত ধোয়া ও পরিচ্ছন্নতার পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। এতে রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মী উভয়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে প্রসূতি ও নবজাতক সেবায় এসব ঘাটতি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রতিবেদনে সমস্যা সমাধানে ভারতের ‘কায়াকল্প’ উদ্যোগকে সফল মডেল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। নিয়মিত মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি ব্যবস্থার মাধ্যমে ২০১৫ সালের ১০০টি থেকে ২০২৫ সালে দেশটির ৫১ হাজারের বেশি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্ধারিত মানদণ্ড অর্জন করেছে।
এ ছাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘাটতি চিহ্নিত ও ধাপে ধাপে উন্নয়নের জন্য ডব্লিউএইচও-ইউনিসেফের ‘ওয়াশ-ফিট’ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বর্জ্য উৎসেই তিন ভাগে পৃথকীকরণ, খোলা জায়গায় পোড়ানোর পরিবর্তে মাল্টি-চেম্বার ইনসিনারেটর ব্যবহার এবং অন্তত দুই দিনের পানি সংরক্ষণ সক্ষমতা নিশ্চিতের মতো পদক্ষেপের কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সানা/আপ্র/২০/৮/২০২৬