২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর গভীর রাত। পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের একটি ভবনের চারতলার ভাড়া বাসায় একাই ঘুমিয়ে ছিলেন নটর ডেম কলেজের অফিস সহকারী লিপিকা জুলিয়ানা গমেজ। ছাদ থেকে রশি বেয়ে নেমে ভেন্টিলেটর ভেঙে ঘরে ঢোকে নজরুল। পরে ভেতর থেকে দরজা খুলে দেওয়া হলে তার সহযোগী জুয়েলও ঢোকে। উদ্দেশ্য ছিল চুরি। কিন্তু ঘুম ভেঙে লিপিকা চিৎকার শুরু করতেই বদলে যায় পুরো পরিস্থিতি।
তদন্তে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআই জানতে পারে, লিপিকার মাথায় লোহার পাইপ দিয়ে আঘাত করে নজরুল। এরপর জুয়েল বালিশ দিয়ে তাঁর মাথা চেপে ধরে। একপর্যায়ে নিস্তেজ হয়ে পড়েন লিপিকা। তাঁর দুটি মুঠোফোন, একটি হাতব্যাগ ও কিছু অলংকার নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে দেয় দুই তরুণ। পরে ওই অলংকারগুলো আসল সোনা নয়, ইমিটেশন হিসেবে শনাক্ত হয়।
পরদিন সকালে লিপিকা কলেজে না যাওয়ায় সহকর্মীরা তাঁর খোঁজ নিতে থাকেন। দুপুরের দিকে কেয়ারটেকারের কাছ থেকে চাবি নিয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকে তাঁর মরদেহ দেখতে পান তাঁরা। এ ঘটনায় ১১ সেপ্টেম্বর সূত্রাপুর থানায় হত্যা মামলা করেন লিপিকার খালাতো ভাই প্রিন্স গমেজ।
মামলাটি তদন্ত শুরু করে পিবিআই। হত্যাকাণ্ডের ১২ দিন পর ২২ সেপ্টেম্বর জুয়েল রানা ও নজরুলকে গ্রেফতার করা হয়। পরে ২০২৫ সালের ৭ মে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন পিবিআইয়ের পরিদর্শক মমিনুল ইসলাম। বর্তমানে মামলাটি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরার পর্যায়ে রয়েছে। দুই আসামিই কারাগারে আছেন।
একা থাকতেন-এই তথ্যই কাল হলো: পিবিআইয়ের তদন্তে বেরিয়ে আসে, লিপিকা দীর্ঘদিন ধরে ওই বাসায় একাই থাকতেন-এ তথ্য জানত পাশের বাসার দারোয়ানের ছেলে জুয়েল। সাত-আট বছর ধরে নজরুলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। জুয়েলই নজরুলকে জানায়, ওই বাসায় একজন নারী একা থাকেন এবং সেখানে চুরি করলে টাকা-পয়সা পাওয়া যেতে পারে।
লিপিকা আগে ভবনের পাঁচতলায় থাকতেন। পরে চারতলার ফ্ল্যাটে ওঠার সময় জুয়েল মজুরির বিনিময়ে তাঁকে বাসা বদলাতে সহযোগিতা করেছিল। সেই সময়ই লিপিকার একা থাকার বিষয়টি জানতে পারে সে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘটনার দুই দিন আগে ৯ সেপ্টেম্বর জুয়েল ও নজরুল বাসাটির আশপাশ ঘুরে দেখে। কীভাবে ভেতরে ঢোকা যায়, সেটিও ঠিক করে তারা। পরদিন গভীর রাতে নজরুল রশির সাহায্যে ছাদ থেকে নিচে নেমে ভেন্টিলেটর ভেঙে ফ্ল্যাটে ঢোকে। পরে ভেতর থেকে দরজা খুলে জুয়েলকে ঢুকিয়ে নেয়।
চিৎকার শুনেই হামলা: ঘরে ঢুকে দুজন যখন মালামাল খুঁজছিল, তখন লিপিকার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি চিৎকার শুরু করলে নজরুল লোহার পাইপ দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করে। এতে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন এবং মাথা থেকে রক্তপাত শুরু হয়। এরপর জুয়েল বালিশ দিয়ে তাঁর মাথা চেপে ধরে।
পিবিআইয়ের তদন্ত ও আদালতে দেওয়া দুই আসামির জবানবন্দি অনুযায়ী, লিপিকা নিস্তেজ হয়ে পড়ার পর তাঁরা ঘর থেকে টাকা, দুটি মুঠোফোন, একটি হাতব্যাগ ও কিছু অলংকার নিয়ে বেরিয়ে যায়। বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে দেয় তারা।
লিপিকার ব্যাগে ছিল ২৬ হাজার ৩৫০ টাকা। ওই টাকা দুই আসামি ভাগ করে নেয়। পরে চুরি করা দুটি মুঠোফোন সদরঘাট এলাকার শিবলু হোসেন ও জয়ের কাছে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করে তারা। সেখান থেকে পাওয়া অর্থও ভাগ করে নেয়। লিপিকার ব্যাগে থাকা অলংকারগুলো সোনার গয়না মনে করে নিয়ে গেলেও পরে পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেগুলো ছিল ইমিটেশন।
মুঠোফোনের সূত্রে গ্রেফতার: তদন্ত কর্মকর্তা মমিনুল ইসলাম জানান, চুরি করা মুঠোফোনের সূত্র ধরেই আসামিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়। প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করে সদরঘাট ও সূত্রাপুর এলাকা থেকে জুয়েল ও নজরুলকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারের সময় তাঁদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি প্লায়ার্স, দুটি স্ক্রু ড্রাইভার এবং লিপিকার চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধার করা হয়। আদালতে দুজনই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জবানবন্দি দেন।
তালা থাকায় প্রথমে সন্দেহ হয়নি: হত্যাকাণ্ডের পরও ফ্ল্যাটের দরজায় বাইরে থেকে তালা লাগানো থাকায় প্রথমে কারও সন্দেহ হয়নি। ১১ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে নয়টার দিকে লিপিকার সহকর্মী জনি কেয়ারটেকার মিতুকে ফোন করে জানতে চান, লিপিকা বাসায় আছেন কি না।
মিতু চারতলায় গিয়ে ফ্ল্যাটের দরজায় তালা দেখতে পান। তিনি নিচে এসে জানান, সম্ভবত লিপিকা কোথাও গেছেন। পরে দুপুরে সহকর্মীরা আবার সেখানে এসে জানান, লিপিকার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
কেয়ারটেকারের কাছে থাকা চাবি দিয়ে দরজা খোলার পর তাঁরা ভেতরে প্রবেশ করেন। ড্রয়িংরুমে আলো জ্বলতে দেখা যায়। উত্তর দিকের জানালার ওপরের ভেন্টিলেটরটি ভাঙা ছিল। শয়নকক্ষে গিয়ে তাঁরা লিপিকাকে খাটের ওপর পড়ে থাকতে দেখেন। মাথার ওপর ও নিচে ছিল বালিশ। বালিশ সরানোর পর তাঁর মাথার বাঁ পাশে রক্তাক্ত জখম দেখা যায়। তখনই তাঁরা বুঝতে পারেন, লিপিকা আর বেঁচে নেই।
কেন একাই থাকতেন লিপিকা: স্বজনদের তথ্য অনুযায়ী, লিপিকা ১৯৯৪ সালে বিয়ে করেছিলেন। পরে পড়াশোনার জন্য লন্ডনে যান। দেশে ফেরার কয়েক বছর পর ২০০০ সালে তাঁর বিচ্ছেদ হয়। এরপর আর বিয়ে করেননি। তাঁর কোনো সন্তানও ছিল না।
২০১৩ সাল থেকে তিনি ওই বাসায় তাঁর ঠাকুরমার সঙ্গে থাকতেন। ঠাকুরমার মৃত্যুর পর একাই বসবাস করতেন। তাঁর বাবা ও বড় বোন আগেই মারা যান। মা থাকতেন গ্রামের বাড়িতে। পারিবারিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান লিপিকা ২০১৬ সালের মার্চে নটর ডেম কলেজে অফিস সহকারী হিসেবে যোগ দেন।
জবানবন্দিতে উঠে আসে ঘটনার বিবরণ: আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে জুয়েল জানায়, ঘটনার দুই দিন আগে সে নজরুলকে লিপিকার একা থাকার কথা বলে। এরপর তাঁরা বাসাটি ঘুরে দেখে। ঘটনার রাতে নোস প্লায়ার্স নিয়ে তারা সেখানে যায়। নজরুল আগে ভেন্টিলেটর দিয়ে ঘরে ঢোকে, পরে জুয়েলও প্রবেশ করে।
ঘরে থাকা টাকা ও মালামাল খোঁজার সময় লিপিকার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি চিৎকার করলে নজরুল তাঁর মাথায় আঘাত করে এবং জুয়েল বালিশ দিয়ে মাথা চেপে ধরে। এরপর তাঁরা দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে যায়। পরে লুট করা টাকা ভাগ করে নেয়। রশিসহ কিছু জিনিস বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার কথাও জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।
নজরুলও আদালতে একই ধরনের জবানবন্দি দেয়। মামলার বাদী প্রিন্স গমেজ জানান, এখন পর্যন্ত মামলায় ২১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। প্রশাসনের সহযোগিতায় মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত এগোচ্ছে বলে তিনি জানান।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৯/৮/২০২৬