ভারতের কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে। নিহত বাংলাদেশিদের চারজনই কুষ্টিয়ার একই পরিবারের সদস্য। চিকিৎসা শেষে বুধবার দেশে ফেরার কথা থাকলেও আগুনে প্রাণ হারান সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন, তিন বছরের ছেলে শর্ণশীষ দত্ত ও আফসানার বাবা আকরাম আলী। অপর শনাক্ত বাংলাদেশি ঢাকার সাভারের আমিনবাজারের আহমেদ বাবু।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দিবাগত গভীর রাতে নিউমার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের পাঁচতলা ভবনের ‘শিখা ইন’ নামের হোটেলে আগুনের সূত্রপাত হয়। ভবনটিতে একাধিক হোটেল ও অতিথিশালা ছিল। আগুনের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ঘন ধোঁয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় ৮০ জনকে জীবিত উদ্ধার করে। এ ঘটনায় নয়জনের মৃত্যু এবং কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কলকাতায় বাংলাদেশের উপহাইকমিশনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল, স্থানীয় পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। নিহতদের পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে। শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই পরিবারের চারজনের করুণ মৃত্যু: নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার বাসিন্দা। তিনি দৈনিক আজকের পত্রিকা ও একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পাশাপাশি স্থানীয় দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। এর আগে তিনি বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমেও কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন।
স্বজন ও সহকর্মীরা জানান, গত ৩ আগস্ট স্ত্রী আফসানা শারমীন ও তিন বছরের ছেলে শর্ণশীষকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য ভারতে যান দেবাশীষ। সঙ্গে ছিলেন তাঁর শ্বশুর আকরাম আলী। প্রথমে কলকাতা থেকে তাঁরা বেঙ্গালুরু যান। চিকিৎসা শেষে মঙ্গলবার রাতে কলকাতায় ফিরে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই হোটেলে ওঠেন। বুধবারই তাঁদের দেশে ফেরার কথা ছিল।
কুষ্টিয়ার বাড়িতে তখন ছিলেন দেবাশীষের আট বছরের মেয়ে মহিমা। মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই আড়ুয়াপাড়ার বাড়িতে স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশী ও সহকর্মীদের ভিড় জমে যায়।
দেবাশীষের মা স্বপ্না দত্ত ছেলেকে হারিয়ে বারবার আহাজারি করে বলেন, ‘তোমরা আমার দেবাকে এনে দাও।’ তাঁর বাবা দিলীপ দত্তও শোকে ভেঙে পড়েছেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, আগের দিনও দেবাশীষ কুষ্টিয়ায় থাকা মা-বাবার জন্য বাজার-সওদা করে পাঠিয়েছিলেন।
দেবাশীষের সহকর্মী ও বন্ধু তৌহিদ হাসান শিপলু বলেন, কুষ্টিয়ার তরুণ সাংবাদিকদের সংগঠিত ও সমৃদ্ধ করতে দেবাশীষ সম্প্রতি ‘রাইজিং জার্নালিস্ট কমিউনিটি’ নামে একটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
ধোঁয়ার মধ্যে ছাদে উঠে প্রাণ বাঁচান বাংলাদেশিরা: অগ্নিকাণ্ড থেকে বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশিরাও জানিয়েছেন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। গাজীপুরের মহম্মদ আসাফুল জামাল ও তাঁর ভাই হোটেলের চতুর্থ তলায় ছিলেন। আগুনের খবর পেয়ে নিচে নামার চেষ্টা করলেও ঘন ধোঁয়ার কারণে তা সম্ভব হয়নি। পরে কোনোক্রমে ছাদে উঠে ২০ থেকে ২৫ জনের সঙ্গে পানির ট্যাংকের পাশে আশ্রয় নেন তাঁরা।
ঢাকার মহম্মদ নাজমুল সরকারও একই ভবনে ছিলেন। হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া নাজমুল জানান, ধোঁয়ার কারণে একপর্যায়ে শ্বাস নিতে পারছিলেন না। মোবাইল ফোনের আলো জ্বালিয়ে অন্ধকার ও ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে তিনি ওপরে ওঠেন।
আরেক বাংলাদেশি কাওসার হোসেন সন্তানসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিচের একটি হোটেলে ছিলেন। আগুন লাগার পর বাইরে বেরিয়ে এসে তাঁর মনে পড়ে পাসপোর্ট ভেতরে রয়ে গেছে। পরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আবার আগুন লাগা ভবনের ভেতরে ঢুকে পাসপোর্ট নিয়ে বের হন তিনি।
অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন: স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ভবনটির সরু প্রবেশপথ, সংকীর্ণ সিঁড়ি, অপর্যাপ্ত বাতাস চলাচল এবং ঘনবসতিপূর্ণ কক্ষের কারণে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক কক্ষে জানালাও ছিল না। ফলে আগুনের পাশাপাশি ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যুর আশঙ্কা তৈরি হয়।
প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাতের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও কারণ এখনো চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হয়নি। হোটেলগুলো অগ্নিনিরাপত্তা বিধি মেনে চলছিল কি না, প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার তদন্তে কলকাতা পুলিশ বিশেষ তদন্ত দল গঠন করেছে। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকার হোটেল, লজ ও অতিথিশালার অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন ও নিরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া বাংলাদেশিদের অনেকেই নিউমার্কেট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ও মির্জা গালিব স্ট্রিটের তুলনামূলক কম খরচের হোটেলে অবস্থান করেন। ফলে এই অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের চার সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যু নয়, কলকাতায় অবস্থানরত বাংলাদেশি রোগী ও তাঁদের স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তথ্যসূত্র: রয়টার্স, এপি ও দেশি একাধিক সংবাদসংস্থা।
সানা/আপ্র/২০/৮/২০২৬