বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে এখনো আশাবাদী নয়াদিল্লি। তবে সফরের নির্দিষ্ট তারিখ বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নতুন কোনো তথ্য জানায়নি ভারত। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল এ অবস্থান জানান।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতে অবস্থানরত বিভিন্ন মামলার আসামিদের প্রত্যর্পণকে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের অনুকূল পরিবেশ তৈরির অন্যতম শর্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যেই ভারত দুই দেশের সম্পর্ককে পারস্পরিক স্বার্থ, সমতা ও পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী রাখার ওপর জোর দিয়েছে।
তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ভারত সফর নিয়ে প্রশ্নের জবাবে জয়সোয়াল বলেন, এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তিনি সাংবাদিকদের জানাবেন। তবে ভারত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দেশটি সফরের জন্য আন্তরিকভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
সফরের সম্ভাব্য সময় নিয়ে বিভিন্ন ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে নানা তথ্য প্রকাশিত হলেও বাংলাদেশ এখনো সফরের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো ঘোষণা দেয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে অনুকূল কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। এ অবস্থায় সফরটি কবে হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে পুরোনো অবস্থান
দিল্লিতে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলন নিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অসন্তোষ এবং তাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধের বিষয়েও প্রশ্ন করা হয় জয়সোয়ালকে।
জবাবে তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ ভারতের প্রচলিত আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে ভারতের অবস্থানে নতুন কিছু নেই। প্রত্যর্পণের অনুরোধ নির্ধারিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এর আগে বাংলাদেশ ভারতকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ আবেদনের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানায়। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়, এ বিষয়ে অগ্রগতি হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে।
জয়সোয়াল একই সঙ্গে বলেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থ ও সমতার ভিত্তিতে ইতিবাচক, গঠনমূলক এবং ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। দুই দেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও তিনি জানান।
অতিরিক্ত জ্বালানি নিয়ে ভারতের পর্যালোচনা
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারত থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি আমদানির অনুরোধ করা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে জয়সোয়াল তা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতা চলমান রয়েছে। ভারতের নিজস্ব চাহিদা, পরিশোধন সক্ষমতা এবং পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত জ্বালানি দেওয়া সম্ভব কি না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
ভারতের জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে এর আগেও একই ধরনের অবস্থান জানিয়েছিল নয়াদিল্লি। বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের মধ্যে অতিরিক্ত সরবরাহের সম্ভাবনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে।
৫৪ অভিন্ন নদীর পানি নিয়ে দিল্লির বক্তব্য
ভারত-বাংলাদেশের অভিন্ন নদী ও পানিবণ্টন নিয়েও ব্রিফিংয়ে প্রশ্ন ওঠে। জয়সোয়াল বলেন, দুই দেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এসব নদীর পানি নিয়ে আলোচনা বা সহযোগিতা দুই দেশের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর মাধ্যমেই হতে হবে।
তিনি বলেন, পানিসম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনসহ বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সংলাপের কাঠামো রয়েছে। অভিন্ন নদীর পানি নিয়ে যেকোনো আলোচনা এসব ব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্পন্ন করা হবে।
এর আগে তিস্তার পানিবণ্টন এবং তিস্তা প্রকল্পে চীনের আগ্রহ নিয়েও ভারতীয় মুখপাত্রের কাছে প্রশ্ন করা হয়েছিল। জয়সোয়াল এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু না বলে অভিন্ন নদীগুলোর পানিব্যবস্থাপনায় দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর ওপর গুরুত্ব দেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় পক্ষ থেকেই উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করে দুই দেশের সম্পর্ককে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী করার বিষয়ে ভারতের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। পরে তিনি দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও বৈঠক করেন।
তবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর, জ্বালানি সহযোগিতা ও অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো দুই দেশের সম্পর্কের আলোচনায় বড় হয়ে আছে। এ অবস্থায় তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে নয়াদিল্লি আশাবাদী থাকলেও সফরের চূড়ান্ত সময়সূচি এখনো অনিশ্চিত।
সানা/আপ্র/১৯/৮/২০২৬