প্রায় প্রতিদিনই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর খবর আসছে। এক সময় ডেঙ্গু শুধু রাজধানী ঢাকার সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হতো, কিন্তু এখন রাজধানী ছাড়িয়ে অন্যান্য বড় শহর ও জেলা-উপজেলা শহরে বিস্তৃত হয়েছে। ফলে তা প্রায় সারা বছর চলমান এক জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, এক দিনে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এ কয়েকজনের মৃত্যু শুধু পরিসংখ্যান নয়, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ১৮ জনের মৃত্যু এবং প্রায় ছয় হাজার মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রমাণ করে, ডেঙ্গুকে আর মৌসুমি সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এখন নগর ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক সক্ষমতার সম্মিলিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এবং এর মধ্যে শিশুও রয়েছে। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, বরিশাল, খুলনা ও রাজশাহীতে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা দেখাচ্ছে যে, ডেঙ্গু এখন সারাদেশের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে নানা কর্মসূচির ঘোষণা শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবতায় সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা ও কার্যকারিতা খুব কমই দেখা যায়। ফলে মৌসুম শেষ হলে সচেতনতা ও কার্যক্রমও শিথিল হয়ে পড়ে।
বলা বাহুল্য, সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগ ও সিটি করপোরেশন সমন্বিতভাবে কাজ করার যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ডেঙ্গু মোকাবিলায় কার্যকর পরিবর্তন আসতে পারে; বিশেষ করে রোগ নজরদারি, তথ্য বিশ্লেষণ, চিকিৎসাকর্মীদের প্রশিক্ষণ, দ্রুত শনাক্তকরণ ও কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা এখন অত্যন্ত প্রয়োজন।ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। কিন্তু বাস্তবে নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, জলাবদ্ধতা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এডিস মশার বিস্তারে সহায়ক হয়ে উঠছে। শুধু ফগার মেশিন ব্যবহার বা ওষুধ ছিটিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা। কোন এলাকায় সংক্রমণ বাড়ছে, কোথায় লার্ভার ঘনত্ব বেশি, কোন অঞ্চলে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছেÑ এসব তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতিও জোরদার করা জরুরি। ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়লে অনেক হাসপাতালে শয্যাসংকট, পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা দেখা দেয়। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পর্যাপ্ত স্যালাইন, প্লাটিলেট পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী মজুদ রাখতে হবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক নয়, বরং সঠিক তথ্য ও সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গু মোকাবিলা কেবল স্বাস্থ্য বিভাগের একার দায়িত্ব নয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণ- সবাইকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। নিজের বাসাবাড়ি, ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার অভ্যাস গড়ে না উঠলে কোনো কর্মসূচিই দীর্ঘ মেয়াদে সফল হবে না। প্রতিবছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার পর তৎপরতা বাড়ে, কিন্তু সংকট কমে গেলে উদ্যোগও স্তিমিত হয়ে পড়ে। এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বছরব্যাপী পরিকল্পনা, জবাবদিহিমূলক কার্যক্রম এবং সমন্বিত জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধ অসম্ভব কিছু নয়। এ জন্য চাই সরকারের সদিচ্ছা। সরকার বা রাষ্ট্রের দৃঢ়তা ছাড়া তা মোকাবিলা সম্ভব নয়। তাই আমাদের প্রত্যাশা, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নেবে সামাজিক সংগঠনসহ সরকার।
আপ্র/কেএমএএ/০২.০৭.২০২৬