গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

মেনু

মাদকের ভয়াবহতা নির্মূলে চাই শক্ত হাতে নীরব যুদ্ধ

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:৫৮ পিএম, ০১ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২২:০০ এএম ২০২৬
মাদকের ভয়াবহতা নির্মূলে চাই শক্ত হাতে নীরব যুদ্ধ
ছবি

ছবি সংগৃহীত

মো. শামসুল আলম

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসার নাম ‘মাদক ব্যবসা’! সমাজের সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে মাদকের কারবার ও ব্যবহার হচ্ছে। সরকারি হিসাবে জনসংখ্যার ৫ শতাংশ মাদকাসক্ত বলা হলেও বাস্তবে সংখ্যাটি অনেক বেশি। এমন কোনো পরিবার পাওয়া কঠিন, যেখানে মাদকের ছোবল পৌঁছায়নি। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো, মাদক সেবনকারীদের প্রায় ৮০ শতাংশই কিশোর এবং তরুণ। পরিস্থিতির ভয়াবহতা এমন যে মাদক আজ বাংলাদেশের অন্যতম বড় জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। শহর কিংবা গ্রাম দারিদ্র্য বা বেকারত্ব নয়, প্রধান সমস্যা মাদক! এটি শুধু একটি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; বরং এটি জনস্বাস্থ্য, জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, শিক্ষা, পরিবার, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বহুমাত্রিক হুমকি। একটি দেশকে ধ্বংস করতে সবসময় যুদ্ধের প্রয়োজন হয় না; মাদকও একটি জাতিকে ভেতর থেকে ধীরে ধীরে অক্ষম করে দিতে পারে। আজ বাংলাদেশের লাখো তরুণ-তরুণী মাদকের ছোবলে আক্রান্ত। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র- সবখানেই এর প্রভাব বিস্তার করছে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান মাদক পাচারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করিডোর: বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান মাদক পাচারকারীদের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক। দেশটির প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের সীমান্ত রয়েছে, যা বিশ্বের কুখ্যাত ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’  অঞ্চলের খুব কাছাকাছি। এই অঞ্চল বহু দশক ধরে ইয়াবা, হেরোইন ও সিনথেটিক মাদক উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন, ইনজেকশন জাতীয় মাদকসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ দ্রব্য বাংলাদেশে প্রবেশ করে। অন্যদিকে মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে বিশেষ করে ইয়াবার বিশাল চালান দেশে আসে। সমুদ্রপথ এবং আকাশপথও আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের জন্য ব্যবহৃত হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে অনেক সময় আন্তর্জাতিক ট্রানজিট রুট হিসেবেও ব্যবহার করা হয়।

অতীত থেকে বর্তমান মাদকের পরিবর্তিত চিত্র: এক সময় বাংলাদেশে সীমিত আকারে গাঁজা ও ফেনসিডিলের ব্যবহার দেখা যেত। কিন্তু গত দুই দশকে ইয়াবা, আইস, কোকেন, এলএসডি, এমডিএমএ এবং বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম মাদক দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। সরকারি হিসাবে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে: গাঁজায় ৫২ শতাংশ, ইয়াবায় ২০ শতাংশ, মদ্যপানে ১৭ শতাংশ, ফেনসিডিল ও অন্যান্য মাদকে ১১ শতাংশ। মাদকবিষয়ক প্রতিবেদনে দেশের চারটি অঞ্চলের ১০৪টি ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের ৮ জেলার ৪৩টি, পূর্বাঞ্চলের ৪ জেলার ২১টি, উত্তরাঞ্চলের ৫ জেলার ২১টি এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলা কক্সবাজারের ১৯টি ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে।

বর্তমানে মাদক ব্যবসা একটি উচ্চ মুনাফার অবৈধ শিল্পে পরিণত হয়েছে। অল্প সময়ে বিপুল অর্থ উপার্জনের লোভে অনেক যুবক এই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ ও গোয়েন্দা সংস্থার বিভিন্ন সময় প্রকাশিত পরিসংখ্যানে সারা দেশে মাদক কারবারির সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার বলে উল্লেখ করা হলেও প্রকৃত সংখ্যা আরো কয়েকগুণ হবে। দেখা গেছে, পাড়ার বখাটে মাস্তান থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীরা পর্যন্ত মাদকের ব্যবসা করে ‘লালে লাল’ হয়ে যাচ্ছে- যাদের বেশির ভাগই সমাজে নামধাম নিয়ে আছে। তারা থাকে প্রশাসনের মধ্যেই। কিন্তু থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।

কেন এত সহজলভ্য মাদক: আজ শহর থেকে গ্রাম-সবখানেই মাদক সহজে পাওয়া যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে গড়ে উঠেছে অদৃশ্য বা ‘ইনভিজিবল’ মাদকের বাজার। মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ছোট ছোট চালানে নির্দিষ্ট খুচরা ব্যবসায়ী বা ভোক্তাদের কাছে মাদক সরবরাহ পৌঁছে দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি টাকা লেনদেন না করে বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থায় হিসাব নিষ্পত্তি করা হয়; যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে যায়। মাদক ব্যবসার অর্থপাচারে হুন্ডি নেটওয়ার্কও ব্যবহৃত হয় বলে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তদন্তে উঠে এসেছে।

তরুণ সমাজের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হচ্ছে: মাদক সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে তরুণদের ওপর। আজ শুধু বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ নয়; অনেক ক্ষেত্রে স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও মাদকের সংস্পর্শে আসছে। সঙ্গী-সাথীদের মাধ্যমে ধুমপান দিয়ে শুরু হয়, ধীরে ধীরে একের পর এক নতুন মাদকে জড়িয়ে পড়ে। মাদকাসক্ত একজন শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, পরিবার থেকে দূরে সরে যায়, অপরাধে জড়িয়ে পড়ে এবং একসময় নিজের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে ফেলে। একজন মাদকাসক্ত মানে শুধু একজন ব্যক্তি নয়; একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া—দেশ ধংস হওয়া।

মাদকের সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষতি: মাদক পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি করে; বিয়ে বিচ্ছেদ বৃদ্ধি পায়; পারিবারিক সহিংসতা বাড়ে; চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই বেড়ে যায়; কর্মক্ষমতা কমে যায়; দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায়; প্রসূতিদের ক্ষেত্রে বিকলাঙ্গ ও অসুস্থ সন্তান জন্মদান; শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়; একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র- তিনটিরই বোঝায় পরিণত হয়।

ধর্ষণ, হত্যা ও সহিংস অপরাধে মাদকের ভূমিকা: সব ধর্ষণ বা হত্যাকাণ্ডের জন্য মাদককে দায়ী করা যাবে না। তবে বিভিন্ন গবেষণা ও অপরাধ বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাদকাসক্তি আত্মনিয়ন্ত্রণ কমিয়ে দেয়, বিচারবোধ দুর্বল করে এবং সহিংস আচরণের ঝুঁকি বাড়ায়। মাদকের অর্থ জোগাড় করতেও অনেকেই চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, খুন, বা অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। মাদকের কারণে চুরি, ডাকাতি ছিনতাইয়ের সাথে সংশ্লিষ্টতা প্রমানিত হলে- মূল অপরাধ চুরি, ডাকাতি ইত্যাদির শাস্তির সাথে মাদকের শাস্তিও প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ ডাবল শাস্তি দিতে হবে। মাদকের কারণে শিশু ধর্ষণ বাড়ছে। মাদকাসক্তরা বিশেষ বিশেষ মাদক গ্রহণের কারণে যৌনতাড়িত হয়ে পড়ে। মাদকাসক্তির প্রভাবে শারীরিক অক্ষমতার কারণে তারা প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের ওপর যৌনাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে অক্ষম হবার কারণে অপ্রাপ্তবয়স্ক বাচ্চাদের সহজ টার্গেট করে। এ কারণে মাদকাসক্তির সঙ্গে যৌন হয়রানি/নির্যাতনের অপরাধ যুক্ত হলে তার দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল এবং গুরুতর শাস্তি হবে।

সরকারের উদ্যোগ কেন কাক্সিক্ষত সাফল্য আসছে না: সরকার বিভিন্ন সময়ে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছে। যথা- মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, সীমান্তে নজরদারি, পুনর্বাসন কেন্দ্র, জনসচেতনতা কর্মসূচি। তবুও কাক্সিক্ষত ফল আসছে না। এর অন্যতম কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও দুর্বলতা; সীমান্তের দুর্বলতা; আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের ব্যাপকতা; দুর্বল তদন্ত ও সাক্ষ্যের অপ্রতুলতা; সনাতনী বিচারে দীর্ঘসূত্রতা; পুনর্বাসনের সীমাবদ্ধতা; নতুন মাদকের দ্রুত বিস্তার; পারিবারিক, সামাজিক ও শিক্ষকদের পর্যাপ্ত চাপের ব্যর্থতা।

দুর্নীতি, সিন্ডিকেট ও প্রভাবশালী চক্র: মাদক ব্যবসা সাধারণত সংগঠিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ সর্বজনবিদিত হেেলা খুব কমই আইনের আওতায় আসে। অনেক ক্ষেত্রে বড় অর্থদাতা বা মূল পরিকল্পনাকারীরা সমাজের মধ্েয প্রভাবশালী হওয়া আইনের আওতার বাইরে থেকে যায়, সাধারণ মানুষ সাক্ষ্যদানে উৎসাহি হয় না, কেবল ধরা পড়ে মাঠপর্যায়ের বাহক। যদি সত্যিই মাদক নির্মূল করতে হয়, তাহলে কেবল খুচরা বিক্রেতা নয়, পুরো অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। অভিযোগ যেই ব্যক্তির বিরুদ্ধেই উঠুক না কেন, নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

সীমান্ত নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: মাদক প্রবেশ বন্ধ না করতে পারলে ভেতরের অভিযান দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না। সীমান্তে আধুনিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা নজরদারি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করে বিশেষ কম্বিং অপারেশন পরিচালনার বিষয়ে অনেক বিশেষজ্ঞ গুরুত্বারোপ করেন। সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও সমন্বয় জরুরি।

আইনের কঠোরতা: অনেকের মতে মাদক পাচার, উৎপাদন ও বড় আকারের সরবরাহের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থাকা উচিত। অন্যদিকে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলেন, শাস্তির কঠোরতার পাশাপাশি নিশ্চিত বিচার, দুর্নীতিমুক্ত তদন্ত এবং অপরাধ প্রতিরোধই বেশি কার্যকর। বাংলাদেশে অতীতে বিএনপি সরকার অ্যাসিড সন্ত্রাস দমনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান কঠোর আইন প্রণয়ন করে ও বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সংসদের চলতি সেশনেই মাদক পাচার ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আইন প্রণয়ন করতে পারে। কঠোর প্রশাসনিক ও সামাজিক উদ্েযাগ নিয়ে আইন কার্যকর বাস্তবায়ন করতে পারলে মাদক নির্মূলে সফলতা আসতে পারে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: মাদক সমস্যা সমাধানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। মাদক সমস্যা সমাধানে সবচেয়ে সফল ও আলোচিত দেশ পর্তুগাল। ২০০১ সালে তারা একটি বৈপ্লবিক নীতি গ্রহণ করে- যার মূল লক্ষ্য ছিল মাদককে ‘অপরাধ’ হিসেবে না দেখে একে একটি ‘জনস্বাস্থ্য সমস্যা’ হিসেবে বিবেচনা করা। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর মাদক পাচারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর আইন প্রয়োগের জন্য পরিচিত। মালয়েশিয়ায় (মাদক অপব্যবহার আইন) অনুযায়ী মাদক পাচার, আমদানি বা রফতানি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। কারও কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি (যেমন- ১৫ গ্রাম হেরোইন, ৩০ গ্রাম কোকেন বা ৫০০ গ্রাম গাঁজা) মাদক পাওয়া গেলেই তাকে মাদক পাচারকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। সিঙ্গাপুরের মাদক অপব্যবহার আইন অনুযায়ী কারো কাছে ২০০ গ্রামের বেশি গাঁজার রজন, বা ১৫ গ্রামের বেশি বিশুদ্ধ হেরোইন বা ৩০ গ্রাম কোকেন পাওয়া গেলে বাধ্যতামূলকভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

ফিলিপাইনে মাদক পাচারের বিরুদ্ধে প্রধান ও কঠোরতম আইনের অধীনে মাদক পাচার, উৎপাদন, এবং বিক্রির জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে শুরু করে কড়া শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের শাসনামলে (২০১৬-২০২২) তার ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধ’-এর সময় মাদক নির্মূলে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তি যদি প্রতিরোধের চেষ্টা করে বা পুলিশকে হুমকি দেয়, তবে তাকে ‘দেখামাত্র গুলি’ করতে। এই নীতিমালার কারণে পুলিশ ও অজ্ঞাত বন্দুকধারীদের হাতে হাজার হাজার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে; যা বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চিকিৎসা, পুনর্বাসন, প্রতিরোধমূলক শিক্ষা এবং গোয়েন্দা নজরদারির ওপরও জোর দেওয়া হয়। মাদক নেটওয়ার্ক বা ব্যবসার অজুহাতে অন্তত দুটি দেশে (পানামা ও ভেনিজুয়েলা) বলপূর্বক বাংলাদেশ সরকার পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। বাংলাদেশের জন্য একক কোনো বিদেশি মডেল নয়; বরং কঠোর আইন প্রয়োগ, সীমান্ত নিরাপত্তা, দুর্নীতি দমন, পুনর্বাসন এবং জনসচেতনতার সমন্বিত কৌশলই বেশি কার্যকর হতে পারে।

কম ক্ষতিকর মাদক নিয়ে নীতিগত বিতর্ক: বিশ্বের কিছু দেশে গাঁজা সীমিত বা চিকিৎসাগত ব্যবহারের জন্য বৈধ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে প্রতিটি দেশের সামাজিক বাস্তবতা, জনস্বাস্থ্য ও আইনগত কাঠামো ভিন্ন। বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো পরিবর্তন আনতে হলে বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণা, জনস্বাস্থ্য মূল্যায়ন এবং সংসদীয় বিতর্কের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশকে মাদকমুক্ত করতে করণীয়: মাদক পাচার, ব্যবসা, বহন, সরবরাহ ও নেটওয়ার্কের জন্য সংসদে মৃত্যুদণ্ডের আইন পাশ করতে হবে। মাদক নির্মূলে দ্রুত বিচার আইন ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে। প্রশাসন জানে কারা এলাকার মাদক কারবারি। তাই সারা দেশে মাদক ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীদের তালিকা প্রণয়ন করে গ্রেফতারে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। মিয়ানমার সীমান্তে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে কম্বিং অপারেশন করে সব কারবারি ও নেটওয়ার্ক ধরে ফেলতে হবে। সীমান্ত এলাকায় ড্রোন, স্মার্ট নজরদারি, থার্মাল ক্যামেরা ও আধুনিক স্ক্যানিং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। সীমান্তে এবং মাদক সংশ্লিষ্ট এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। স্কুল-কলেজের আশপাশকে মাদকমুক্ত অঞ্চল ঘোষণা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাদকবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত মাদকবিরোধী কাউন্সেলিং সেবা চালু করতে হবে। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে।

মাদক সিন্ডিকেটের অর্থের উৎস, ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও হুন্ডি লেনদেনের ওপর সমন্বিত নজরদারি জোরদার করতে হবে। অর্থপাচার ও হুন্ডি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। মাদক উৎপাদন, পাচার ও অর্থায়নের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবৈধ সম্পদ তদন্ত করে আদালতের আদেশ অনুযায়ী জব্দ ও রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বড় অপরাধীদের দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচারের আওতায় আনতে হবে। আন্তর্জাতিক মাদক চক্র দমনে প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক আইন-প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও যৌথ অভিযান জোরদার করতে হবে। মাদক মামলার তদন্তে অবহেলা, প্রমাণ নষ্ট করা বা অপরাধীদের সহায়তা করলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। কারাগারের ভেতরে মাদক সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে বিশেষ নজরদারি ও নিয়মিত তল্লাশি পরিচালনা করতে হবে। যুবসমাজকে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, কারিগরি শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে মাদকের ঝুঁকি থেকে দূরে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। প্রত্যেক জেলায় আধুনিক ও মানসম্মত মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন এবং চিকিৎসা-পরবর্তী পুনর্বাসন কর্মসূচি নিশ্চিত করতে হবে।

গোপন তথ্যদাতাদের পরিচয় সুরক্ষার ব্যবস্থা করে নাগরিকদের মাদকবিরোধী তথ্য দিতে উৎসাহিত করতে হবে। অনলাইন, সামাজিক মাধ্যম ও কুরিয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমে মাদক বিক্রি ও সরবরাহ রোধে বিশেষ সাইবার নজরদারি ইউনিট গঠন করতে হবে। মাদকের পুনরাবৃত্ত অপরাধে দোষী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আরও কঠোর দণ্ডের বিধান বিবেচনা করা যেতে পারে। মাদক মামলার তদন্ত, প্রসিকিউশন ও বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার না হন এবং প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তি পায়। মাদকবিরোধী অভিযান যেন মানবাধিকার, সংবিধান ও আইনের শাসনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি স্বচ্ছ বিচার, দুর্নীতি দমন, আর্থিক নেটওয়ার্ক ধ্বংস, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং পুনর্বাসনের বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পায়। এই সমন্বিত পদ্ধতিই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর হবে।

উপসংহার: মাদক শুধু একটি অবৈধ ব্যবসা নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে পরিচালিত নীরব যুদ্ধ। একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ প্রজন্ম। সেই প্রজন্ম যদি মাদকের কারণে ধ্বংস হয়ে যায়, তবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কোনো কিছুরই স্থায়ী মূল্য থাকবে না।

মাদক নির্মূল করতে হলে কেবল অভিযান নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, শক্তিশালী সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, কার্যকর বিচারব্যবস্থা, সামাজিক প্রতিরোধ এবং পরিবারভিত্তিক সচেতনতা। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও নাগরিক—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই একটি মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক: সিনিয়র ব্যুরোক্রেট
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

আপ্র/কেএমএএ/০১.০৭.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

গোলাম মোস্তফা ও মুস্তাফা মনোয়ার: দুই প্রজন্মের দুই পথ
০১ জুলাই ২০২৬

গোলাম মোস্তফা ও মুস্তাফা মনোয়ার: দুই প্রজন্মের দুই পথ

আলী আহমাদ মাবরুরগতকাল চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার সাহেব মারা গেছেন। তিনি বাংলাদেশের বিখ্যাত কবি গোলা...

ডিজিটাল আয়নার ভেতর মানুষ, সংযুক্তির ভিড়ে একাকীত্বের গল্প
০১ জুলাই ২০২৬

ডিজিটাল আয়নার ভেতর মানুষ, সংযুক্তির ভিড়ে একাকীত্বের গল্প

ভোরের আলো জানালায় পড়ার আগেই শহর জেগে ওঠে এক নীরব শব্দে-স্ক্রিনের আলোয়। অ্যালার্ম থামার আগেই আঙুল চলে...

চীন-মার্কিন প্রতিযোগিতা: বাংলাদেশের জন্য সুযোগ না সংকট?
০১ জুলাই ২০২৬

চীন-মার্কিন প্রতিযোগিতা: বাংলাদেশের জন্য সুযোগ না সংকট?

সাঈদ ইফতেখার আহমেদ===“রাজনীতি হলো রক্তপাতহীন যুদ্ধ, আর যুদ্ধ হলো রক্তাক্ত রাজনীতি।”-মাও সে তুঙবাংলাদ...

দুর্নীতির সামাজিক জীবন
২৯ জুন ২০২৬

দুর্নীতির সামাজিক জীবন

ড. মতিউর রহমান    দুর্নীতিকে প্রায়ই একটি আইনগত লঙ্ঘন বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেব...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

ধর্ষণ মামলার সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দেশে ধর্ষণের মামলা কিছুটা বেড়েছে বলে যে পরিসংখ্যান দেখা যাচ্ছে, তার অন্যতম কারণ হলো এখন ভুক্তভোগীরা সহজেই মামলা করতে পারছেন। আগে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন হস্তক্ষেপের কারণে অনেক ভুক্তভোগী থানায় গিয়ে মামলা করতে পারতেন না বা করতে চাইতেন না। আপনি কি মনে করেন মন্ত্রীর এই বক্তব্য সঠিক?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 11 ঘন্টা আগে