গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

ঘুষের মহামারি ও রাষ্ট্রের নৈতিক সংকট

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৭:০০ পিএম, ২৯ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১৯:৪৫ এএম ২০২৬
ঘুষের মহামারি ও রাষ্ট্রের নৈতিক সংকট
ছবি

প্রতীকী ছবি

একটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থার প্রধান ভিত্তি হলো-সেবা পেতে তাকে আইন ও ন্যায্যতার ওপর নির্ভর করতে হবে, অর্থের বিনিময়ে নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক এক জরিপে দেশের সেবাখাতে ঘুষের যে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল দুর্নীতির ব্যাপকতাই প্রকাশ করে না; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সুশাসনের গভীর সংকটেরও প্রতিচ্ছবি। উন্নয়নের নানা সূচকে অগ্রগতির দাবির পাশাপাশি যদি নাগরিককে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সেবার জন্য ঘুষ দিতে বাধ্য হতে হয়, তবে সেই উন্নয়নের ভিত্তি যে দুর্বল হয়ে পড়ে, এ সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-র সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ ১২ হাজার ৬০০ কোটি টাকারও বেশি। আগের জরিপের তুলনায় এই অঙ্ক উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ভূমি, বিচার, আইনশৃঙ্খলা, পাসপোর্ট, কৃষি, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিদ্যুৎসহ নাগরিক জীবনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে ঘুষের বিস্তার উদ্বেগজনক মাত্রা লাভ করেছে। আরো হতাশার বিষয়, অধিকাংশ পরিবার কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতির শিকার হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ সেবা পাওয়ার জন্য সরাসরি ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে। অর্থাৎ ঘুষ অনেক ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রম নয়; বরং সেবা পাওয়ার এক অলিখিত শর্তে পরিণত হয়েছে।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, দুর্নীতির বোঝা সমানভাবে সবাই বহন করে না। সমাজের দরিদ্র, প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের মানুষই এর সবচেয়ে বড় শিকার। একটি জমির নথি, একটি পাসপোর্ট, একটি চিকিৎসাসেবা কিংবা ন্যায়বিচার পেতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে তাদের সীমিত আয় আরো সংকুচিত হয়। ফলে ঘুষ কেবল অবৈধ অর্থ লেনদেন নয়; এটি বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়, আইনের শাসনকে দুর্বল করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষয় করে।

এখানে ইতিহাসের একটি তিক্ত বাস্তবতার কথাও স্মরণ করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিষয়ক সূচকে ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচবার বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় ছিল। সে সময় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। সেই অধ্যায় জাতির জন্য ছিল গভীর লজ্জা ও আত্মসমালোচনার বিষয়। বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় থাকায় অতীতের সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায় তাদের ওপর আরো বেশি বর্তায়। আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে কঠোর, নিরপেক্ষ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করাই হবে অতীতের সেই কলঙ্ক থেকে বেরিয়ে আসার সর্বোত্তম পথ।

তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম কোনো একক সরকারের একক দায়িত্ব নয়। এটি রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, সেবাপ্রদান প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিনির্ভর ও মানবিক করতে হবে এবং রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমান আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগকারীর নিরাপত্তা ও দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত না হলে জনগণের আস্থাও ফিরবে না।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তার প্রতিফলন ঘটতে হবে বাস্তব কর্মকাণ্ডে। কারণ ঘুষের বিস্তার শুধু অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে ক্ষয় করে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে এবং উন্নয়নের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। ঘুষের এই মহামারি রোধে আজ যে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনের রাষ্ট্র কতটা ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।
সানা/আপ্র/২৯/৬/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

আইনের শাসন কি দখলদারির কাছে পরাজিত?
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আইনের শাসন কি দখলদারির কাছে পরাজিত?

একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার অস্ত্রভাণ্ডারে নয়, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগে। নাগরিকের নিরাপত্তা, সম্পদের সুরক...

উন্মুক্ত বাংলাদেশের দরজা, খুলে দিতে হবে আস্থার তালা
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উন্মুক্ত বাংলাদেশের দরজা, খুলে দিতে হবে আস্থার তালা

বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত-নিউইয়র্কে ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সামনে প্রধান...

মিরপুরে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হামলা, আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মিরপুরে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হামলা, আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন

রাজধানীর বুকে মধ্যরাতে একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মুখোশধারী বিপুলসংখ্যক ব্যক...

শুধু শান্তির ভাষণ নয়, এবার চাই বিশ্ববাস্তবতার বদল
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শুধু শান্তির ভাষণ নয়, এবার চাই বিশ্ববাস্তবতার বদল

বিশ্ব আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে মারণাস্ত্রের বিস্তার শান্তির নিশ্চয়তা না দিয়ে বরং সংঘাতের...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

আওয়ামী লীগের দোসরদের গ্রেফতারে পুরস্কারের ঘোষণা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দোসরদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের গোয়েন্দা তথ্য কাজে লাগানোর নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে এ ধরনের ব্যক্তিদের গ্রেফতারে যারা ভূমিকা রাখবেন, তাদের পুরস্কৃত করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬-এর পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মন্ত্রীর এই ঘোষণার পক্ষে না বিপক্ষে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 2 দিন আগে