রাজধানীর উত্তরায় ডিএল পেট্রলপাম্পের সোয়া কোটি টাকা লুটের ঘটনায় পেশাদার ডাকাত চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ ও উত্তরা অপরাধ বিভাগ। তাদের কাছ থেকে লুটের ১২ লাখ টাকা, র্যাবের পোশাক ও ভুয়া পরিচয়পত্র, অস্ত্র, গুলি, ওয়াকিটকি, হাতকড়া, বিভিন্ন নম্বর প্লেট ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন মো. ইলিয়াস শিকদার, মো. জাফর, রবিউল ইসলাম ওরফে রুবেল, মিন্টু রাঢ়ি ও সাগর বাড়ৈ। তাঁদের মধ্যে সাগরের বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া রুবেলের বিরুদ্ধে চারটি, মিন্টুর বিরুদ্ধে তিনটি, জাফরের বিরুদ্ধে দুটি এবং ইলিয়াসের বিরুদ্ধে একটি মামলা থাকার তথ্য জানিয়েছে পুলিশ।
গত ৯ আগস্ট সকালে ডিএল পেট্রলপাম্পের কর্মীরা ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যাওয়ার পথে বিমানবন্দর সড়কের ক্রাউন প্লাজার কাছে হামলার শিকার হন। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনটি মোটরসাইকেলে আসা ছয় থেকে সাতজন তাঁদের গতিরোধ করে। অস্ত্র ও চাপাতির ভয় দেখিয়ে এবং একজনকে কুপিয়ে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে তারা পালিয়ে যায়। ছিনতাই হওয়া অর্থের পরিমাণ ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পর ডিবি ও উত্তরা অপরাধ বিভাগ যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে ইলিয়াস শিকদার ও জাফরকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইলিয়াসের বিমানবন্দর এলাকার ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে র্যাব লেখা তিনটি ভেস্ট ও দুটি ক্যাপ, দুটি নম্বর প্লেট, র্যাবের মনোগ্রামযুক্ত চারটি ভুয়া পরিচয়পত্র, তিনটি ওয়াকিটকি, চার জোড়া হাতকড়া, দুটি পিস্তল, তিনটি ম্যাগাজিন ও ছয়টি গুলি উদ্ধার করা হয়।
পরে তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাতুয়াইল থেকে রবিউল ইসলাম ওরফে রুবেল এবং যাত্রাবাড়ীর কাজলারপাড় থেকে মিন্টু রাঢ়িকে গ্রেফতার করা হয়। রবিউলের বাসা থেকে লুটের তিন লাখ টাকা উদ্ধার হয়। মিন্টুর বাসা থেকে র্যাব লেখা চারটি ভেস্ট, ছয়টি নম্বর প্লেট, চারটি ভুয়া পরিচয়পত্র, একটি মোটরসাইকেল, ওয়াকিটকি ও চার্জার, তিন জোড়া হাতকড়া, দুটি পিস্তল, তিনটি ম্যাগাজিন ও ১৫টি গুলি উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শ্যামপুরের পোস্তগোলা থেকে সাগর বাড়ৈকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাঁর কাছ থেকে আরো নয় লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম শনিবার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, চক্রটির সদস্যরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে কাজ করত। একটি দল বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করত এবং টাকা বহনের সময়সূচিসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে অন্য দলকে দিত। এরপর সুযোগ বুঝে অস্ত্রধারী সদস্যরা ডাকাতি করত। কখনো র্যাবের পরিচয় ব্যবহার করেও তারা মানুষের গতিরোধ করত।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীতে একই কৌশলে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও নগদ অর্থ বহনকারীদের লক্ষ্য করে আসছিল। ডাকাতির টাকা সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হতো। পুলিশের ধারণা, এই ঘটনায় আরো ছয় থেকে সাতজন জড়িত রয়েছে। মূল হোতাও এখনো পলাতক। তাঁর বিরুদ্ধে ২০টির বেশি মামলা রয়েছে বলে ডিবি জানিয়েছে।
এদিকে মামলার অন্যতম আসামি সাগর বাড়ৈকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। তদন্ত কর্মকর্তা তাঁর জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলেও ঢাকা মহানগর হাকিমের আদালত সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। শুনানিতে আসামিপক্ষের কোনো আইনজীবী ছিলেন না।
পুলিশ জানিয়েছে, পেট্রলপাম্পের কোনো কর্মী এই ঘটনায় জড়িত থাকার প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি পলাতক সদস্যদের গ্রেফতার এবং লুটের অবশিষ্ট টাকা উদ্ধারে অভিযান চলছে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/১৫/৮/২০২৬