চাল বা ভাত বলতেই সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফুটন্ত পানি, বাষ্প ওঠা হাঁড়ি আর রান্নাঘরে কাটানো সময়। তবে ভারতের আসামে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এমন এক ধরনের ঐতিহ্যবাহী চালের ব্যবহার হয়ে আসছে, যা রান্না ছাড়াই খাওয়া যায়। শুধু পানিতে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখলেই চালটি নরম হয়ে খাবারের উপযোগী হয়ে ওঠে। এর নাম ‘কোমল চাল’।
আসামের এই ঐতিহ্যবাহী চাল স্থানীয়ভাবে ‘কোমল সউল’ নামে পরিচিত। এটি মূলত কম অ্যামাইলোজসমৃদ্ধ ‘চকুয়া’ জাতের ধান থেকে তৈরি করা হয়। ধান কাটার পর তা সেদ্ধ করে শুকিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এই প্রক্রিয়ার কারণে চালটি পানির সংস্পর্শে এলে দ্রুত নরম হয়ে যায়।
কীভাবে রান্না ছাড়াই খাওয়া যায়: সাধারণ চালের মতো কোমল চাল ফুটন্ত পানিতে সেদ্ধ করার প্রয়োজন হয় না। গবেষণা ও প্রচলিত ব্যবহারের তথ্য অনুযায়ী, হালকা গরম পানিতে প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখলেই চালটি নরম হয়ে খাওয়ার উপযোগী হয়। ঐতিহ্যগতভাবে ঠাণ্ডা বা হালকা গরম পানিতেও এটি ভিজিয়ে রাখা হয়।
এর পেছনে রয়েছে চালটির বিশেষ গঠন। অ্যামাইলোজ হলো শ্বেতসারের একটি উপাদান, যা চালের গঠন ও শক্তভাবের ওপর প্রভাব ফেলে। চকুয়া চালে অ্যামাইলোজের পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকায় এটি সাধারণ চালের চেয়ে দ্রুত পানি শোষণ করে এবং সহজেই নরম হয়ে যায়।
দই, গুড়, দুধের সঙ্গে জনপ্রিয়: আসামে কোমল চাল ঐতিহ্যবাহী সকালের নাশতা বা হালকা খাবার ‘জলপান’-এর অন্যতম উপকরণ। পানিতে ভেজানো চালের সঙ্গে দই, গুড়, দুধ, কলা, সরিষার তেল, পেঁয়াজ কিংবা আচার মিশিয়ে খাওয়া হয়। সামাজিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও এর প্রচলন রয়েছে।
বিশেষ করে দই ও গুড়ের সঙ্গে কোমল চালের মিশ্রণ আসামে বেশ জনপ্রিয়। সহজে প্রস্তুত করা যায় এবং পেটও ভরা থাকে বলে এটি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে।
কৃষক ও শ্রমজীবীদের জন্য সুবিধাজনক: রান্নার প্রয়োজন না থাকায় কোমল চাল একসময় কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী ছিল। রান্নার সময় কিংবা জ্বালানি—কোনোটিই না থাকলেও অল্প সময়ে পানি দিয়ে ভিজিয়ে খাবার প্রস্তুত করা যেত।
তবে এটি আধুনিক বাণিজ্যিক ‘ইনস্ট্যান্ট রাইস’ নয়। বরং শত শত বছর ধরে আসামি খাদ্যসংস্কৃতিতে ব্যবহৃত হয়ে আসা একটি ঐতিহ্যবাহী প্রক্রিয়াজাত চাল।
জিআই স্বীকৃতির পর বাড়ছে আগ্রহ: আসামের এই বিশেষ চাল ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে। এর ফলে চালটির কৃষি, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব আরও স্বীকৃতি পেয়েছে।
বর্তমানে আসামের বাইরেও কোমল চাল নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। নতুন প্রজন্মের ভোক্তাদের কাছে এই ঐতিহ্যবাহী খাবার পৌঁছে দিতে প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করার বিভিন্ন উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। ফলে একসময় মূলত স্থানীয় মানুষের খাবার হিসেবে পরিচিত কোমল চাল এখন বৃহত্তর বাজারেও পরিচিতি পাচ্ছে। সূত্র: এনডিটিভি
সানা/ডিসি/আপ্র/১৫/৮/২০২৬