বাংলাদেশে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নেওয়ার প্রচলিত তথ্যকে ‘সঠিক নয়’ বলে দাবি করেছে মিয়ানমার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ২০১৭ সালের সহিংসতার পর উত্তর রাখাইন থেকে ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি ‘বাঙালি’ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। একই সময়ে দুই লাখের বেশি ‘বাঙালি’ উত্তর রাখাইনে থেকে যায়।
শনিবার (১৫ আগস্ট) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বিষয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যকে ‘একতরফা ও ভুল’ বলে দাবি করেছে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ২০১৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বর এবং ২০১৭ সালের আগস্টে আরসা উত্তর রাখাইন রাজ্যের পুলিশ ফাঁড়ি ও ব্যাটালিয়নে সমন্বিত হামলা চালায়। মিয়ানমারের দাবি, এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির সেনাবাহিনী ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ অভিযান চালায়। ওই পরিস্থিতিতে স্থানীয় লোকজন অন্য শহর ও গ্রামে পালিয়ে যায় এবং বিপুলসংখ্যক ‘বাঙালি’ বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
মিয়ানমারের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, আরসার হামলার আগে উত্তর রাখাইনের বুথিডং, মংডু ও রাথেডং এলাকায় ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি ‘বাঙালি’ বসবাস করতেন। সহিংসতার পর তাঁদের মধ্যে দুই লাখের বেশি সেখানে থেকে যান এবং ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি বাংলাদেশে পালিয়ে যান। এই হিসাবের ভিত্তিতে রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেছে দেশটি।
৮ লাখ ২৮ হাজারের তালিকায় যাচাই ৪ লাখ ২৬ হাজার: বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তালিকার মধ্যে ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করার কথা জানিয়েছে মিয়ানমার।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, যাচাই করা ব্যক্তিদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া ৪ হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ বলে দাবি করেছে মিয়ানমার।
বিবৃতিতে বাংলাদেশের শরণার্থীশিবিরে থাকা সবাই মিয়ানমার থেকে আসা-এমন ধারণারও বিরোধিতা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশ থেকে সমুদ্রপথে যাওয়া ব্যক্তিদের রোহিঙ্গা পরিচয়ের সঙ্গে একাকার না করার আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।
প্রত্যাবাসনে আগের উদ্যোগের কথা বলল মিয়ানমার: মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ২০১৭ সালের সংকটের পর বাস্তুচ্যুতদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগ নিয়েছিল। তাদের দাবি, দুই মাসের মধ্যে তিনটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পন্ন করা হয় এবং প্রত্যাবাসনের জন্য তিন দফায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। তবে এসব উদ্যোগের কোনো পর্যায়েই বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিরা মিয়ানমারে ফেরেননি।
বিবৃতিতে ১৯৭৮ ও ১৯৯১-৯২ সালের ঘটনাপ্রবাহের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। মিয়ানমারের দাবি, দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় ১৯৭৮-৭৯ সময়ে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৯৬৮ জন এবং ১৯৯২-২০০৫ সময়ে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৯৫ জন বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিকে দেশটি গ্রহণ করেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমার বলছে, রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরো স্থিতিশীল হলে যাচাই করা সাবেক বাসিন্দাদের প্রত্যাবাসন শুরু করা হবে। প্রত্যাবাসনকে দুই দেশের মধ্যকার বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে এটিকে আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে উপস্থাপনের বিরুদ্ধেও আপত্তি জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মিয়ানমার আরো জানিয়েছে, প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি হিসেবে রাখাইনে ‘আসুন ও দেখুন’ ধরনের একটি কর্মসূচির মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনকারীদের পরিস্থিতি দেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথাও বিবৃতিতে বলা হয়েছে।
তবে মিয়ানমারের এই পরিসংখ্যান ও ব্যাখ্যা ২০১৭ সালের সামরিক অভিযানে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হওয়ার বিষয়ে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের মূল্যায়নের সঙ্গে ভিন্ন। ফলে প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থানের পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত মানুষের পরিচয়, সংখ্যা ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ-এই তিন বিষয়ই ভবিষ্যৎ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকছে।
সানা/আপ্র/১৫/৮/২০২৬