দীর্ঘ চার বছর পর বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার অবসরপ্রাপ্ত ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা অবসর সুবিধার জমানো অর্থের একটি অংশ পেয়েছেন। শনিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাদের প্রাপ্য অর্থ ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ২০২২ সালের পর দীর্ঘ চার বছর ধরে আটকে থাকা অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ৭০ হাজারের বেশি শিক্ষক-শিক্ষিকার জীবনে কিছুটা হলেও অনিশ্চয়তার অবসান হয়েছে।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরকালীন সুবিধার জন্য দুটি তহবিল রয়েছে। এর একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট এবং অন্যটি অবসর সুবিধা বোর্ড।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব তহবিলে শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রতি মাসে অর্থ জমা দেন। এর সঙ্গে সরকারও নির্দিষ্ট হারে অর্থ জমা করে। দীর্ঘ চাকরিজীবন শেষে অবসরে যাওয়ার সময় শিক্ষক-শিক্ষিকারা যাতে একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ হাতে পান, সেটিই ছিল এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য।
অবসর সুবিধা পেতে ভোগান্তির অবসান
অবসর সুবিধার অর্থ পেতে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উদ্দেশ্য মহৎ হলেও চাকরিজীবন শেষে নিজেদের প্রাপ্য অর্থ পেতে তাদের নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। এমনকি নিজেদের টাকা তুলতে গিয়ে ঘুষ দেওয়ার অলিখিত নিয়মও চালু হয়ে গিয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, এবার কোনো ধরনের ভোগান্তি ছাড়াই অনলাইনে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রাপ্য অর্থ তাদের নিজ নিজ ব্যাংক হিসাবে পাঠানো সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষকরা নীতি, নৈতিকতা ও আদর্শের শিক্ষা দিয়ে লাখো শিক্ষার্থীকে গড়ে তোলেন। সেই শিক্ষকদের নিজেদের প্রাপ্য টাকা তুলতে ঘুষ দিতে হলে বা অফিসে অফিসে ঘুরতে হলে তা শুধু তাদের হয়রানি নয়, বরং জাতি হিসেবে আমাদের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে।
দুটি তহবিল নিয়ে সরকারের বক্তব্য
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জন্য গঠিত দুটি তহবিলও আগের সরকারের লুটপাটের কবল থেকে রেহাই পায়নি। জাল ইনডেক্স তৈরি, অর্থ দুর্বল ব্যাংকে সরিয়ে নেওয়া এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ধ্বংসের মাধ্যমে তহবিল দুটিকে প্রায় দেউলিয়া করে ফেলা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এর ফলে সারাজীবন শিক্ষার আলো ছড়ানো শিক্ষক-শিক্ষিকারা জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন। ২০২২ সাল থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকারা এসব তহবিল থেকে অর্থ পাচ্ছিলেন না বলেও দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অবসরকালীন সুবিধার অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে জানান তিনি। তবে পরে দেখা যায়, দুটি তহবিলেই পর্যাপ্ত অর্থ নেই। ৭০ হাজারের বেশি শিক্ষক-শিক্ষিকার দুরবস্থা বিবেচনায় সরকারকে বিশেষ ব্যবস্থায় তাদের অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
ভবিষ্যতে অনলাইনে অর্থ দেওয়ার আশ্বাস
তারেক রহমান বলেন, যতদিন বর্তমান নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে, ততদিন অবসরকালীন সুবিধার অর্থ পেতে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আর অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না। তাদের যাতে কোনো ধরনের ভোগান্তি পোহাতে না হয়, সে ব্যবস্থা সরকার করবে।
কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর হয়রানিও তাদের সহ্য করতে হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যথাসময়ে অনলাইনে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রাপ্য অর্থ কোনো ভোগান্তি ছাড়াই তাদের ব্যাংক হিসাবে পৌঁছে দেওয়া হবে।
অবসরেও শিক্ষকদের সামাজিক দায়িত্ব
অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের অবসর-পরবর্তী ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, শিক্ষকতা এমন একটি পেশা, যার মাধ্যমে অন্য সব পেশার মানুষ তৈরি হয়। শিক্ষকতা থেকে অবসর নিলেও তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থী বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও হবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রচলিত নিয়মে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নিলেও শিক্ষক হিসেবে তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তারা এখনো সমাজের শিক্ষক। বাংলাদেশের ধর্মীয়, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় জনমানসে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকারা সমাজে আলোকবর্তিকা হিসেবে ভূমিকা রাখবেন বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
এসি/আপ্র/১৫/০৮/২০২৬