গত ২ মে রাজধানীতে ধানমন্ডির ১১ নম্বর সড়কের একটি ভবনের ১৩ তলার ছাদ থেকে পড়ে ৩২ বছর বয়সি অর্ণবের মৃত্যু হয়। শুরুতে ঘটনাটি অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হলেও পরে তার মায়ের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে হত্যা মামলা করেছে পুলিশ। অথচ মৃত্যুর তিন মাস পরও এর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অর্ণবের মা হালিমা খাতুনুরের অভিযোগ, তার সাবেক স্বামী ও ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার রেখে যাওয়া বিপুল সম্পত্তি দখল কেন্দ্র করে অর্ণবকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ অভিযোগে অর্ণবের চাচা ওসমান গনি ভূঁইয়া, তার স্ত্রী মাসুদা বেগম মায়াসহ ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার করছেন ওসমান গনি। তার দাবি, অর্ণবকে তিনি ছোটবেলা থেকে নিজের সন্তানের মতো করে বড় করেছেন। তাকে হত্যার কোনো কারণ বা লাভ তার নেই।
পারিবারিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী অর্ণবের বাবা রফিকুল ইসলাম ২০১৭ সালে মারা যাওয়ার পর তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দেখাশুনার দায়িত্বে ছিলেন ছোট ভাই ওসমান গনি। রফিকুল ইসলামের জীবদ্দশাতেও তিনি এসব সম্পত্তি দেখাশোনা করতেন।
অর্ণব পড়াশোনা শেষ করার পর কয়েক বছর ধরে বাবার সম্পত্তি ও প্রতিষ্ঠান দেখাশোনা করছিলেন। পরিবারের দাবি, বাবার সম্পত্তি নিয়ে চাচার সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়।
মৃত্যুর আগে অর্ণব ধানমন্ডির বাইরে সেগুনবাগিচায় তার বাবার নামে থাকা একটি প্রায় ১ হাজার ৬০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট ২ কোটি টাকায় বিক্রি করছিলেন বলে পরিবার জানিয়েছে। এই বিক্রয় নিয়েও ওসমান গনির সঙ্গে তার বিরোধ হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
অর্ণবের মা হালিমা খাতুন বলেন, ফ্ল্যাট বিক্রির সিদ্ধান্ত অর্ণব নিজেই নিয়েছিলেন। বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ তিন ভাইবোনের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করা হয়েছিল।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অর্ণবের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড ও বিভিন্ন ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। মৃত্যুর আগে তার মোবাইলে আসা সর্বশেষ কলটি কিশোরগঞ্জের এক জমি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এসেছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পরিবারের দাবি, রফিকুল ইসলামের পরিবারের কিছু জমি বিক্রির বিষয়ে ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলোচনা চলছিল। অর্ণব এসব জমি বিক্রিতে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে শেষ কলের বিষয়টি অর্ণবের মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কি না, তা এখনো নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
অর্ণবের মৃত্যুর পর কিশোরগঞ্জে থাকা পরিবারের সম্পত্তি রক্ষায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। হালিমা খাতুনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কিশোরগঞ্জ জেলা জজ আদালত সম্পত্তির ওপর স্থিতাবস্থা জারি করেছেন।
পরিবারের অভিযোগ, সম্পত্তি দেখাশুনার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মচারীকেও হুমকি দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ওসমান গনি ভূঁইয়া ও তার স্ত্রী মাসুদা বেগম মায়াসহ অর্ণবের পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি। তদন্তের প্রয়োজনে তাদের আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
এ বিষয়ে ধানমন্ডি থানার ওসি ইমদাদুল ইসলাম বলেন, অর্ণবের মোবাইল ফোন, ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। কোনো ধরনের হুমকি, চাপ বা ব্ল্যাকমেইলের তথ্য সেখানে পাওয়া যায় কি না; তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর পাশাপাশি অর্ণবের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ভিসেরা রিপোর্টের অপেক্ষা করা হচ্ছে। তার শরীরে কোনো নেশাজাতীয় দ্রব্য বা বিষক্রিয়ার আলামত পাওয়া যায় কি না, সেটিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কেএমএএ/আপ্র/১৪.০৮.২০২৬