নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার প্রায় দুই বছর পর অবশেষে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হলো মুক্তিযুদ্ধে নিহত ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সদস্যদের স্মরণে নির্মিত ‘মৈত্রীস্তম্ভ’। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে নির্মিত এই স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর ইতিহাস, মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর যৌথ লড়াই এবং আত্মত্যাগের স্মৃতি তুলে ধরা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে আশুগঞ্জ উপজেলার কামাউরা এলাকায় প্রায় ৩ দশমিক ৬১ একর জমির ওপর নির্মিত মৈত্রীস্তম্ভ কমপ্লেক্সটি উদ্বোধন করে দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। উদ্বোধনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ।
জেলা প্রশাসক বলেন, মৈত্রীস্তম্ভটি আনুষ্ঠানিকভাবে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে উদ্বোধনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন এটি পড়ে থাকায় ধুলাবালু জমে স্থাপনাটি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তাই এটি এখন সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে।
তবে কমপ্লেক্সটির ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কে নেবে, সে সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। এটি ইজারা দেওয়া হবে, নাকি প্রশাসন নিজেই পরিচালনা করবে—এ বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান জেলা প্রশাসক।
মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত অধ্যায়ের স্মারক: ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ড গঠিত হওয়ার পর পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও সমন্বিত রূপ পায়। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভারতীয় সেনারাও বিভিন্ন রণাঙ্গনে লড়াই করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় সেই যুদ্ধে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর বহু সদস্য প্রাণ হারান। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধে প্রায় এক হাজার ৬৬১ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন।
সেই আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে ২০১৭ সালে আশুগঞ্জে মৈত্রীস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ কোটি টাকা। পরে কয়েক দফায় সময় ও ব্যয় বাড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত প্রায় ৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণকাজ শেষ হয়।
কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও প্রায় দুই বছর সেটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্থাপনাটি কার্যত অযত্নেই পড়ে ছিল।
পাথরে খোদাই আত্মত্যাগের স্মৃতি: মৈত্রীস্তম্ভের মূল স্মৃতিস্তম্ভের নিচের চারপাশে মুক্তিযুদ্ধে নিহত ভারতীয় সেনাসদস্যদের নাম খোদাই করা হয়েছে। কমপ্লেক্সের দেয়ালজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ঘটনা ও মিত্রবাহিনীর ভূমিকার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
সেখানে রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ, ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের দুর্দশা এবং মিত্রবাহিনীর বিভিন্ন সামরিক অভিযানের দৃশ্য। যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, ট্যাংক ও কামানের চিত্রের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সামরিক বাস্তবতাও তুলে ধরা হয়েছে।
স্মৃতিস্তম্ভের নিচের অংশে রয়েছে অফিস ও জাদুঘর। কমপ্লেক্সের দুটি প্রবেশফটকের মাঝখানে নির্মাণ করা হয়েছে একটি ফোয়ারা। স্মৃতিস্তম্ভের পূর্ব ও পশ্চিম পাশে দর্শনার্থীদের জন্য কয়েকটি দোকান ও একটি রেস্তোরাঁ রয়েছে, যেগুলো ফুড কোর্ট হিসেবে ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছে। পেছনে রয়েছে শিশুদের জন্য একটি পার্ক।
আশুগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কাজী রবিউস সারোয়ার বলেন, ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সদস্যদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্বের ঐতিহাসিক সম্পর্কের স্মারক হিসেবেই মৈত্রীস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।
তিনি জানান, ২০২৪ সালে মৈত্রীস্তম্ভ ও শিশু পার্কটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া গণপূর্ত বিভাগ আশুগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করে। পরে কমপ্লেক্সটির সৌন্দর্য বাড়াতে রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়াসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগানো হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রঞ্জন চন্দ্র দেসহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, মৈত্রীস্তম্ভ শুধু ভারতীয় মিত্রবাহিনীর আত্মত্যাগের স্মৃতিই ধারণ করবে না, এটি নতুন প্রজন্মের সামনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরারও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে উঠবে।
সানা/আপ্র/১৪/৮/২০২৬