ডারউইন টেস্টের দ্বিতীয় দিনও বাংলাদেশের দখলে। অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী বোলিং আক্রমণকে দুর্দান্ত দক্ষতায় সামলে ইতিহাস গড়েছেন ওপেনার তানজিদ হাসান। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে সেঞ্চুরি করেছেন তিনি।
দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে ৮১ ওভারে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৩ উইকেটে ২৯০ রান। নাজমুল হোসেন শান্ত অপরাজিত ৮০ ও মুশফিকুর রহিম ২৬ রানে খেলছেন। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানের জবাবে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে ৯২ রানে।
টানা পাঁচ সেশন বাংলাদেশের
প্রথম দিন অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পর ১ উইকেটে ৯৬ রানে দিন শেষ করেছিল বাংলাদেশ। দ্বিতীয় দিনও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন তানজিদ হাসান ও মুমিনুল হক।
প্রথম সেশনে ২৭ ওভারে ১ উইকেট হারিয়ে ৮৫ রান তোলে সফরকারীরা। লাঞ্চে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ২ উইকেটে ১৮১। তানজিদ অপরাজিত ছিলেন ৭৪ রানে, আর নাজমুল ২৮ রানে।
শতরানের জুটি ভাঙলেন হ্যাজলউড
তানজিদ ও মুমিনুল দ্বিতীয় উইকেটে ১০২ রানের দারুণ জুটি গড়েন। ৯৫ বলে ৮ চারে ৪৯ রান করে জশ হ্যাজলউডের বলে উইকেটরক্ষক অ্যালেক্স কেয়ারির হাতে ধরা পড়ে ফিরেন মুমিনুল।
এর আগে টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম ফিফটি স্পর্শ করেন তানজিদ। ১০২ বলে ৫০ রানে পৌঁছান তিনি।
ইতিহাসের সেঞ্চুরি
মুমিনুল আউট হওয়ার পর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকে নিয়ে আরও এগিয়ে যান তানজিদ। ৬৪তম ওভারের শেষ বলে ন্যাথান লায়নের বিপক্ষে সিঙ্গেল নিয়ে ১৮৮ বলে পূর্ণ করেন টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি।
এই শতকটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে কয়েকটি কারণে—
* এটি তানজিদের দ্বিতীয় টেস্টেই প্রথম সেঞ্চুরি;
* অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে এটি বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরি;
* প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজলউড ও ন্যাথান লায়নের মতো বিশ্বসেরা বোলারদের বিপক্ষে এসেছে এই ইনিংস।
সেঞ্চুরির পর অবশ্য বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি তিনি। লায়নের ফুল লেংথ বল লং অফের ওপর দিয়ে মারতে গিয়ে মিচেল স্টার্কের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন ১০১ রানে। ১৯৭ বলে খেলা তাঁর ইনিংসে ছিল ৮টি চার ও ১টি ছক্কা।
শান্তর ফিফটি, মুশফিকের দৃঢ়তা
তানজিদের সেঞ্চুরির আগে ফিফটি পূর্ণ করেন নাজমুল হোসেন শান্ত। ৭৪ বলে ৫০ রানে পৌঁছান বাংলাদেশ অধিনায়ক। তানজিদ বিদায়ের পর মুশফিকুর রহিমকে নিয়ে ইনিংস গড়ে তুলছেন তিনি।
চা-বিরতিতে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ৩ উইকেটে ২৮৬। দ্বিতীয় সেশনে ২৭ ওভারে ১০৫ রান তোলে বাংলাদেশ, হারায় কেবল তানজিদের উইকেট। চতুর্থ উইকেটে শান্ত ও মুশফিকের জুটিতে ৬৭ বলে পঞ্চাশ রান আসে।
শান্ত ১১৪ বলে ৭ চার ও ১ ছক্কায় ৭৯ রানে অপরাজিত ছিলেন, আর মুশফিক ৩৫ বলে ৪ চারে খেলছিলেন ২৬ রানে।
নতুন বলেও ভাঙেনি প্রতিরোধ
৮০ ওভার শেষ হতেই দ্বিতীয় নতুন বল নেন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। আক্রমণে ফেরানো হয় মিচেল স্টার্ককে। নতুন বলের প্রথম ডেলিভারিই ছিল দুর্দান্ত সুইং করা ইয়র্কার, যা অল্পের জন্য নাজমুলের অফ স্টাম্প এড়িয়ে যায়। এরপর শান্ত সিঙ্গেল নিলেও মুশফিক স্টার্কের বাকি চারটি বল সফলভাবে মোকাবিলা করেন।
এর আগে তৃতীয় সেশনের শুরুতে অস্ট্রেলিয়া আক্রমণে এনেছিল তাদের অষ্টম বোলার মার্নাস লাবুশেনকে। মূল চার বোলারের পাশাপাশি ক্যামেরন গ্রিন, বাউ ওয়েবস্টার ও ট্রাভিস হেডও বল করেছেন, কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি।
স্মিথের ‘ট্রিকি’ মন্তব্যের জবাব ব্যাটে
ম্যাচের আগের দিন স্টিভেন স্মিথ ডারউইনের উইকেটকে ‘ট্রিকি’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু তানজিদ, মুমিনুল ও নাজমুলের ব্যাটিং দেখে সেই মন্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার খুব বেশি মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তানজিদ অবশ্য কিছুটা ভাগ্যবানও ছিলেন। ব্যক্তিগত ৬২ রানে ন্যাথান লায়নের বলে স্লিপে তাঁর ক্যাচ ফেলেন স্টিভেন স্মিথ। প্রথম দিনও শূন্য রানে জীবন পেয়েছিলেন এই ওপেনার।
বাংলাদেশের স্বপ্নের অবস্থান
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৩ বছর পর টেস্ট খেলতে নেমে বাংলাদেশ এখন স্বপ্নের মতো অবস্থানে। প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে অস্ট্রেলিয়াকে অলআউট করার পর ব্যাট হাতেও দারুণ নিয়ন্ত্রণ দেখাচ্ছেন শান্তরা।
হাসান মাহমুদের ৬ উইকেটের পর তানজিদের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি ও শান্ত-মুশফিকের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে ডারউইন টেস্টে এখন চাপে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াই। হাতে সাত উইকেট রেখে বাংলাদেশের সামনে বড় লিড গড়ার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের একাদশ: সাদমান ইসলাম, তানজিদ হাসান, মুমিনুল হক, নাজমুল হোসেন শান্ত (অধিনায়ক), মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস (উইকেটরক্ষক), মেহেদী হাসান মিরাজ, তাসকিন আহমেদ, ইবাদত হোসেন, হাসান মাহমুদ, নাহিদ রানা।
ম্যাচ সামারি
ডারউইন টেস্ট, প্রথম টেস্ট
অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংস: ১৯৮
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ৮১ ওভারে ২৯০/৩
তানজিদ হাসান — ১০১ (১৯৭ বলে, ৮ চার, ১ ছক্কা)
নাজমুল হোসেন শান্ত — ৮০ (১১৬ বলে, ৭ চার, ১ ছক্কা)
মুমিনুল হক — ৪৯
মুশফিকুর রহিম — ২৬
উইকেট: ন্যাথান লায়ন ২, জশ হ্যাজলউড ১।
বাংলাদেশ এগিয়ে: ৯২ রানে
দিনের উল্লেখযোগ্য দিক
* অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে প্রথম বাংলাদেশি সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ হাসান।
* মুমিনুল-তানজিদের ১০২ রানের জুটি।
* শান্তর টেস্ট ক্যারিয়ারের সপ্তম ফিফটি।
* বাংলাদেশ টানা পাঁচটি সেশন নিজেদের করে নিয়ে ম্যাচে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
সানা/আপ্র/১৪/৮/২০২৬