গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

মেনু

বাংলাদেশে ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা আল-কায়েদার, জাতিসংঘের সতর্কতা

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩:৩০ পিএম, ১৪ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১৪:২৮ এএম ২০২৬
বাংলাদেশে ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা আল-কায়েদার, জাতিসংঘের সতর্কতা
ছবি

ফাইল ছবি

বাংলাদেশকে ব্যবহার করে সন্ত্রাসী সেল ও নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা—এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে। সংগঠনটি বড় ও দৃশ্যমান ইউনিটের পরিবর্তে ছোট, বিচ্ছিন্ন সেল এবং গোপন আর্থিক ও সরবরাহ নেটওয়ার্কের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে বলেও সতর্ক করেছে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষণ দল।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটবিষয়ক বিশ্লেষণাত্মক সহায়তা ও নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ দলের ৩৮তম প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ায় জঙ্গি তৎপরতার পরিবর্তিত ধরন তুলে ধরে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বিশেষ উদ্বেগ জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা বাংলাদেশে নিজেদের সেল প্রতিষ্ঠা এবং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের সুযোগ খুঁজছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, একসময় তুলনামূলক বড় সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল থাকা আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা এখন ছোট, বিকেন্দ্রীভূত ও পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন সেলের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার দিকে ঝুঁকেছে। একই সঙ্গে তারা নিজেদের কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে সরবরাহ, যোগাযোগ ও অর্থসংস্থানের গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে।

জাতিসংঘের এই পর্যবেক্ষণ বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। কারণ, সরাসরি বড় ধরনের সাংগঠনিক উপস্থিতির পরিবর্তে ছোট ছোট সেলের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে জঙ্গি নেটওয়ার্ক বিস্তারের ঝুঁকি বাড়ে। অনলাইন যোগাযোগ, ব্যক্তিভিত্তিক উগ্রবাদে প্ররোচনা এবং বিচ্ছিন্ন সদস্যদের ব্যবহার করেও এ ধরনের নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ভারতের দিল্লির লালকেল্লার কাছে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখার সম্পৃক্ততা চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে সংগঠনটির আঞ্চলিক তৎপরতার ধরন এবং সীমান্ত অতিক্রম করে নেটওয়ার্ক বিস্তারের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ছোট সেলে বদলে যাচ্ছে জঙ্গি তৎপরতা: জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা বর্তমানে একটি খণ্ডিত সংগঠন থেকে ধীরে ধীরে আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠনের বৈশিষ্ট্য অর্জন করছে। বড় সাংগঠনিক ইউনিটের পরিবর্তে ছোট ও ছড়িয়ে থাকা সেল, স্থানীয় যোগাযোগ এবং আর্থিক ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর তাদের নির্ভরতা বাড়ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকেন্দ্রিক সন্ত্রাসী তৎপরতার প্রভাব পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আফগানিস্তান থেকে পরিচালিত বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্য এখনো স্থায়ী হুমকি হয়ে আছে বলে পর্যবেক্ষণ দলের মূল্যায়নে বলা হয়েছে।

জাতিসংঘের আগের প্রতিবেদনেও আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখার আফগানিস্তানে সক্রিয় থাকার তথ্য উঠে এসেছিল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ৩৭তম প্রতিবেদনে সংগঠনটির দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তানে সক্রিয় থাকার কথা বলা হয়। ওই প্রতিবেদনে সংগঠনটির শীর্ষ নেতা ওসামা মাহমুদ এবং তার উপপ্রধান আতিফ ইয়াহিয়া গৌরির কাবুলে অবস্থানের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছিল।

আফগানিস্তান ঘিরে বাড়ছে আঞ্চলিক ঝুঁকি: জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণে আফগানিস্তানকে ঘিরে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। আল-কায়েদা সেখানে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনকে সহায়তা করছে বলে আগের পর্যবেক্ষণেও উল্লেখ করা হয়েছিল। বিশেষ করে পাকিস্তানের তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের সঙ্গে আল-কায়েদার যোগাযোগ ও সহযোগিতা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তে সন্ত্রাসী হামলা ও পাল্টা অভিযানের কারণে উত্তেজনা বাড়ছে। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আফগানিস্তান থেকে উদ্ভূত সন্ত্রাসী হুমকি এখনো বহাল রয়েছে। তালেবান কর্তৃপক্ষ ইসলামিক স্টেটের খোরাসান শাখাসহ বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালালেও সব ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও ইসলামিক স্টেট ও সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক নেটওয়ার্কগুলোর সক্ষমতা আগের তুলনায় কমেছে। তবে বিচ্ছিন্ন সেল, উগ্রবাদে আকৃষ্ট ব্যক্তি, অনলাইন নিয়োগ এবং অনুপ্রাণিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ঝুঁকি এখনো রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাসায়নিক অস্ত্র নিয়েও উদ্বেগ: আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেট—দুই সংগঠনই দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্র তৈরির প্রতি আগ্রহ দেখিয়ে আসছে বলেও প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে। তবে এ ধরনের অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও সাংগঠনিক সক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে সংগঠনগুলো এখনো বড় ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণ দলের মূল্যায়ন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ দিকে ভারতের কর্তৃপক্ষ ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত সন্দেহে একজন চিকিৎসকসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের রাসায়নিক বিষ রাইসিন তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে। একই সময়ে সিরিয়ায় সাবেক সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান সংগ্রহের চেষ্টার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিরিয়ায় দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর ২০২৪ সালে বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়ার পর সেখানে তৈরি হওয়া নিরাপত্তাশূন্যতার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে ইসলামিক স্টেট—এমন তথ্যও উঠে এসেছে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণে।

বিশ্বজুড়ে ছোট সেল, অপহরণ ও অর্থসংগ্রহ: বিশ্বব্যাপী আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের তৎপরতার ধরনও বদলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাহেল, সোমালিয়া, ইয়েমেন ও মধ্য আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে সংগঠন দুটির সহযোগী গোষ্ঠীগুলো নিরাপত্তাশূন্যতা কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।

আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে জামাত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়া আল-মুসলিমিন মালি সরকারের বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত রেখেছে। একই অঞ্চলে ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে তাদের সংঘাতও তীব্র হয়েছে। ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে আল-কায়েদার আরব উপদ্বীপ শাখা এবং মধ্য আফ্রিকায় সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

অর্থ সংগ্রহ ও স্থানীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করার কৌশল হিসেবে আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের সহযোগী সংগঠনগুলো এখনো মুক্তিপণের জন্য অপহরণকে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বলে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার বন্ডি বিচে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইহুদিদের হানুক্কা উৎসবে গুলির ঘটনায় ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনাও প্রতিবেদনে আলোচনায় এসেছে। তদন্তে হামলাকারীদের ইসলামিক স্টেটের মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতিসংঘের সর্বশেষ মূল্যায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের হুমকি কেবল বড় হামলা বা দৃশ্যমান প্রশিক্ষণশিবিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ছোট সেল, বিচ্ছিন্ন সদস্য, অনলাইন যোগাযোগ, অর্থ ও সরবরাহের গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে বাংলাদেশে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখার সম্ভাব্য সেল গঠনের বিষয়ে জাতিসংঘের এই সতর্কবার্তা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য নতুন করে সতর্ক হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।
সানা/আপ্র/১৪/৮/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে দেশে ফিরলেন নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেউবা
১৪ আগস্ট ২০২৬

দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে দেশে ফিরলেন নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেউবা

দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখে ছয় মাসের চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেছেন নেপালের...

মক্কা চুক্তির তিন দেশ পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্ক, কার সামরিক শক্তি কতটা
১৩ আগস্ট ২০২৬

মক্কা চুক্তির তিন দেশ পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্ক, কার সামরিক শক্তি কতটা

গত শুক্রবার সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে পাকিস্তান, তুরস্ক ও...

বিতর্কিত দ্বীপ সফরে পুতিন, জাপানের কড়া প্রতিক্রিয়া
১৩ আগস্ট ২০২৬

বিতর্কিত দ্বীপ সফরে পুতিন, জাপানের কড়া প্রতিক্রিয়া

বিতর্কিত কুরিল দ্বীপপুঞ্জে প্রথমবারের মতো সফর করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তার এ সফরের কড়...

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি চুক্তি পুনর্বহাল নিয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি: ইরান
১৩ আগস্ট ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি চুক্তি পুনর্বহাল নিয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি: ইরান

পারস্য উপসাগরে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধে প্রচেষ্টা নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র তীব্র মতবিরোধে লিপ্ত হয়ে আছ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই