গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬

মেনু

ভুক্তভোগী, তবু কেন সমাজে কন্যাশিশুকেই শাস্তি পেতে হয়

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:১১ পিএম, ১২ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২১:১০ এএম ২০২৬
ভুক্তভোগী, তবু কেন সমাজে কন্যাশিশুকেই শাস্তি পেতে হয়
ছবি

ছবি সংগৃহীত

শাহানা হুদা রঞ্জনা    

আমাদের চোখের সামনে নারীকে অপমান ও অসম্মান করার বেশ কয়েকটি ঘটনা পরপর ঘটে গেল। অধিকাংশ ভুক্তভোগীই কিশোরী বা শিশু। নারায়ণগঞ্জের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রীটিকে লাথি মারার সেই দৃশ্যের ভিডিও টিকটক ও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর সবাই ঘটনাটি জানতে পারে। ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক ও মেয়েটির জন্য অবমাননাকর। এটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হলেও সেই ছাত্রীর বিরুদ্ধেই উচ্ছৃঙ্খলতার অভিযোগ এনেছিল স্কুল কর্তৃপক্ষ। এমনকি প্রথমেই তাকে স্কুল থেকে টিসি দেওয়া হয় এবং তার পরিবারকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়।

স্কুলছাত্রীকে টিসি দেওয়ার বিষয়ে কাঁচপুর ওমর আলী উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবদুল মতিন প্রধান বলেছেন, ‘ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় বিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়া এবং উচ্ছৃঙ্খল আচরণের অভিযোগে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি, এলাকাবাসী—আমরা সবাই বসে ছাত্রীর পরিবারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছি।’ প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরে ওই ‘টিসি পাওয়া’ শিক্ষার্থীকে আবার বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর স্কুলছাত্রীকে লাথি দেওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত কিশোরকে সমাজসেবা বিভাগের প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে পরিবারের জিম্মায় দিয়েছে পুলিশ।

সবচেয়ে অবাক করার ব্যাপার হলো, ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর প্রথমে স্থানীয় একটি সালিসে অভিযুক্ত ছেলেটিকে কান ধরে ওঠবস করিয়ে ক্ষমা চাওয়ানো হয়েছিল। পরে বিষয়টি পুলিশের নজরে আসায় পুলিশ ওই অভিযুক্ত কিশোরকে আটক করেছে। এদিকে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পরিবার আইনগত ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী না হওয়ায় ঘটনাটি থানায় গড়ায়নি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, স্কুল কর্তৃপক্ষ কীভাবে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারল? স্কুলের যে ছাত্রীকে লাথি মারা হলো, তাকেই কারণ দর্শানো এবং টিসি দেওয়া হলো কেন? আমাদের সমাজ প্রথমেই ভুক্তভোগীর দিকে আঙুল তোলে, তাকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং তাকেই প্রশ্ন করে।

যে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হওয়ার পর নারীর জন্য বড় ট্রমা হলো এই ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ বা ভুক্তভোগীকে দোষারোপ। যে নারী বা শিশু হয়রানির শিকার হন, তাকেই নানা ধরনের কুযুক্তি দিয়ে ওই ঘটনার জন্য দায়ী করার চেষ্টা করে সমাজ। যেমনটা করেছিলেন কাঁচপুর ওমর আলী উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দাবি, মেয়ে দুটি স্কুল চলাকালীন সময়ে বাইরে ঘোরাঘুরি করে স্কুলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছিল।

স্কুলের প্রধান হিসেবে এটা তার খুবই অন্যায় যুক্তি ছিল। কারণ স্কুল ফাঁকি দিয়ে কোনো ছাত্রী যদি বাইরেও যায়, তাই বলে কি তাকে অন্য কোনো কিশোর এসে লাথি মারতে পারে? নাকি টিকটক করে তা ছড়িয়ে দিতে পারে? এই ঘটনার দায় কেন চতুর্থ শ্রেণির ওই ছাত্রীর হবে? এমনও হতে পারে, ওই ঘটনার জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ হয়তো হয়রানির শিকার মেয়েটিকেই কোনোভাবে ‘দুষ্কর্মের সহযোগী’ হিসেবে দেখছে। এখানে লাথি মারার ভিডিও থাকার পরও মেয়েটিকে বিশ্বাস করেনি স্কুল; তাই তাকেই কঠিন শাস্তি দিয়েছিল।

পিতৃতন্ত্র এমন এক সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে পুরুষের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নারীর তুলনায় অনেক বেশি। তাই এ ধরনের ঘটনার পর ছেলেটির ওপর পুরো দোষ না চাপিয়ে মেয়েটি কেন স্কুল চলাকালে বাইরে গিয়েছিল, তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর প্রথমে স্থানীয় একটি সালিসে অভিযুক্ত ছেলেটিকে কান ধরে ওঠবস করিয়ে ক্ষমা চাওয়ানো হয়েছিল। পরে কোনো রকম শাস্তি না দিয়ে বা সংশোধনাগারে না পাঠিয়ে পরিবারের কাছে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। ছেলেটি কি বুঝতে পেরেছে যে এই বয়সেই সে একটি বড় অপরাধ করেছে? এখনই যদি তাকে ঠিকমতো বোঝানো না হয়, তাহলে ভবিষ্যতেও সে এ ধরনের বা আরও ভয়াবহ কোনো অপরাধ করতে পারে।

স্কুল কর্তৃপক্ষের অযৌক্তিক ও হঠকারী সিদ্ধান্তের হাত থেকে মেয়েটির পরিবারও নিষ্কৃতি পায়নি। তাদেরও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এ দেশে একটি সাধারণ পরিবার মেয়ের অসম্মানের চেয়ে ‘পরিবারের সম্মান’-এর দিকটাই বেশি দেখে। দেশে এখনো যেকোনো সহিংসতাকে ব্যক্তিগত অপরাধের পরিবর্তে ‘পারিবারিক লজ্জা’ হিসেবে দেখা হয়। ফলে পরিবারকে মামলা না করতে চাপ দেওয়া হয় এবং ঘটনা গোপন রাখতে বলা হয়।

অন্যদিকে ভুক্তভোগীকেই দায়ী করা হয়- যাতে পরিবার এই সমাজের সমালোচনা এড়াতে পারে। তাই তো ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পরিবার আইনগত ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী হয়নি। কোনো মামলা না করায় ঘটনাটি থানায় গড়ায়নি। সমাজ যেহেতু সব সময় ভিকটিমের দিকে চোখ রাখে, সেই হিসাবে সহিংসতার দায় অপরাধীর পরিবর্তে ভুক্তভোগীর ওপর চাপানোটা সহজ হয়ে যায়। এর মাত্র কিছুদিন আগে এক তরুণীকে জুতার মালা পরিয়ে চুল কেটে দেওয়া হয়েছে।

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জের একটি গ্রামে চুরির অভিযোগে ১৮ বছর বয়সী ওই তরুণীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর, গলায় জুতার মালা পরানো ও মাথার চুল কেটে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় তার ১২ বছর বয়সী ছোট বোনকেও একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। এ ঘটনায় নির্যাতনের শিকার তরুণীর পরিবারের সদস্যদের হুমকি দিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

মেয়েটির পরিবারের করা মামলার এজাহার অনুযায়ী এক দোকানদারের খারাপ প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মেয়েটিকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। যখন অপরাধীর পক্ষে থাকা লোকজন দেখে যে অপরাধীর বদলে ভুক্তভোগীর আচরণ নিয়ে আলোচনা করলে ঘটনার দায় স্থানান্তর করা যায়, তখন তারা নানাভাবে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি সেদিকেই ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এক ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। ভিকটিম মেয়েটির ওপর চুরির অপবাদ দেওয়া হয়েছে।

খুবই দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, গাছের সঙ্গে বেঁধে, জুতার মালা পরিয়ে, চুল কেটে নেওয়ার ঘটনায় সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন কয়েকজন নারী। আমরা অনেকেই ভাবি, নারীর প্রতি পুরুষের বিদ্বেষ থাকতে পারে; কিন্তু নারীর প্রতি নারীর বিদ্বেষ কেন থাকবে? একজন নারী আরেকজন নারীকে কেন ছোট করবেন, মন্দ কথা বলবেন ও চলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবেন? এ রকমটাই হয় সব সময়। কারণ নারীর মধ্যেও ‘নারীবিদ্বেষ’ বা মিসোজিনি কাজ করে। নারী বিদ্বেষ বলতে বোঝায় নারীর প্রতি ঘৃণা বা বিরাগের মনোভাব, যেখানে নারীকে শুধু নারী হওয়ার কারণে ঘৃণা করা হয়। এই নারীবিদ্বেষের কারণেই বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা, নারী অবমাননা, যৌন হয়রানি, বলপ্রয়োগ ও হত্যা বেড়েছে।

পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে নারী নারীর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। মূলত ক্ষমতাবান পুরুষ যেভাবে বিচার করে বা যে চোখে নারীকে দেখে, নারীও সেভাবেই নারীকে দেখে। পুরুষ যাকে ‘মন্দ নারী’ মনে করে, নারীও তাকেই মন্দ নারী মনে করে। নারীদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত নানা ধরনের কুসংস্কারও নারীকে নারীর বিরুদ্ধে দাঁড় করায়।

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় অষ্টম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী ও এক তরুণকে ‘আপত্তিকর অবস্থার অজুহাতে’ স্কুলের ভেতরে দেবদারু গাছে বেঁধে প্রকাশ্যে নির্যাতন করা হয়। ওই অমানবিক নির্যাতনের ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হলে চরম অপমান ও লোকলজ্জা সইতে না পেরে ওই স্কুলছাত্রী আত্মহত্যার চেষ্টা করে। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এভাবে সামাজিক বিচারের নামে মানুষকে, বিশেষ করে নারীকে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের ঘটনাগুলো দেশজুড়ে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

কেন বাংলাদেশে এ ধরনের শাস্তিমূলক ঘটনা মেয়েদের বিরুদ্ধে বৃদ্ধি পেয়েছে? বাংলাদেশে নারীদের বিরুদ্ধে চুরির মিথ্যা অপবাদ, টিকটক করা বা প্রেমের সম্পর্কের দোহাই দিয়ে মারধর কিংবা জুতার মালা পরানোর মতো মধ্যযুগীয় কায়দায় সামাজিক নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় মামলা হলেও বছরের পর বছর ধরে বিচার প্রক্রিয়া ঝুলে থাকে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। স্থানীয় পর্যায়ে সাধারণ মানুষের একাংশ নিজেরাই তাৎক্ষণিক বিচার বা মব জাস্টিস করতে পছন্দ করছে। কারণ মব সন্ত্রাসেরও কোনো বিচার হয় না।

শুধু কি অসহায় গ্রামীণ নারীর ক্ষেত্রেই বিদ্বেষ, ট্রল ও সহিংসতা চলছে? চব্বিশের আন্দোলনে রাজপথে যে নারীরা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, স্লোগানে, সাহসিকতায় ও নেতৃত্বে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছিলেন, বিজয়ের পর তাদের অনেকেই আজ নীরব। কিন্তু কেন? জুলাই বিপ্লবের পর নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে নারীদের নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্বাধীনতায় নেতিবাচক প্রভাব ও নিপীড়নের ঘটনা বেড়েছে। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী প্রথম সারির নারীরা বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে অনলাইন ও অফলাইনে নারীদের লক্ষ্য করে ট্রল, গালাগালি এবং সাইবার বুলিংয়ের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

নারীর চুল ধরে টানা, শরীরে আঘাত করা, আজেবাজে গালি ছুড়ে দেওয়া-সবই হয়েছে চব্বিশ-পরবর্তী সময়ে। যাঁরা এই পুরো আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, সেই সব নারীকেই সামাজিক ও সাইবার নিপীড়নের মুখোমুখি পড়তে হয়েছে এবং হচ্ছে। সেখানে সাধারণ নারীর অবস্থা সহজেই অনুমেয়।

লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

কেএমএএ/আপ্র/১২.৮.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

মামলা হয়, ধোঁয়া কমে না
১২ আগস্ট ২০২৬

মামলা হয়, ধোঁয়া কমে না

ড. হারুন রশীদ    ঢাকার রাস্তায় কালো ধোঁয়া এখন আর আকস্মিক কোনো দৃশ্য নয়; বরং নগর...

প্রতিষ্ঠান বাড়ানোর পাশাপাশি চাই শিক্ষার মানোন্নয়ন
১০ আগস্ট ২০২৬

প্রতিষ্ঠান বাড়ানোর পাশাপাশি চাই শিক্ষার মানোন্নয়ন

মো. মুখলেছুর রহমানএকটি দেশের উন্নতি ও অগ্রগতি বহুলাংশে নির্ভর করে সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। শিক্...

অরাজকতার দুষ্টচক্র: সমাজে দুর্নীতি, ক্ষমতা ও সুবিধাভোগী শ্রেণির উত্থান
১০ আগস্ট ২০২৬

অরাজকতার দুষ্টচক্র: সমাজে দুর্নীতি, ক্ষমতা ও সুবিধাভোগী শ্রেণির উত্থান

লে. কর্নেল খন্দকার মাহমুদ হোসেন, এসপিপি, পিএসসি (অব.)    কোনো দেশে যদি সুশাসন দু...

গাইড বইয়ের ছায়ায় হারিয়ে যাচ্ছে পাঠ্যবই
০৯ আগস্ট ২০২৬

গাইড বইয়ের ছায়ায় হারিয়ে যাচ্ছে পাঠ্যবই

নজরুল ইসলামশিক্ষা কি শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার নাম? নাকি শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে, যুক্তি দি...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই