একটি সভ্য সমাজের পরিচয় নির্ভর করে সে সমাজ তার শিশু ও নারীদের কতটা নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে- এর ওপর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শিশু নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, পারিবারিক নির্যাতন ও নারীদের ওপর ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনা আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে। প্রতিটি এমন ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তি বা পরিবারের ক্ষতি নয়; পুরো সমাজের নৈতিকতার ওপর আঘাত।
শিশুরা পৃথিবীতে আসে নিরাপদ শৈশব, ভালোবাসা ও স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু যখন কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হয়, তখন তার শৈশবের পাশাপাশি ভবিষ্যৎও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক শিশু ভয়, লজ্জা বা সামাজিক চাপে মুখ খুলতে পারে না। ফলে অপরাধীরা বারবার একই ধরনের অপরাধ করার সুযোগ পেয়ে যায়। তাই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্র- সবার দায়িত্ব শিশুদের জন্য এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে তারা নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে এবং কোনো অন্যায়ের শিকার হলে নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারে। পাশাপাশি শিশু সুরক্ষায় স্কুল, মাদ্রাসা, কোচিং সেন্টার, আবাসিক প্রতিষ্ঠান ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত নজরদারি, কাউন্সেলিং এবং নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থাও জরুরি। অনেক সময় নির্যাতন শারীরিক নয়, মানসিক ও ডিজিটাল মাধ্যমেও ঘটে। তাই এসব ক্ষেত্রেও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
সমাজে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার অপব্যবহার আজও বহু নারীর স্বাধীনতা ও মর্যাদার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরুষতন্ত্র তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন কেউ নিজের লিঙ্গ, সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক ক্ষমতা বা প্রভাবকে ব্যবহার করে নারীর কণ্ঠস্বর দমন করতে চায়। কর্মক্ষেত্র, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা জনপরিসর- যেখানেই ক্ষমতার এই অপব্যবহার ঘটে, সেখানেই মানবিক মূল্যবোধ পরাজিত হয়। শুধু শারীরিক নির্যাতন নয়, অবমাননাকর ভাষা, নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ, হুমকি, হয়রানি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়াও ক্ষমতার অপব্যবহারেরই অংশ।
নারীর প্রতি সম্মান কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার। একজন নারীকে তার পোশাক, পেশা, মতামত বা জীবনযাত্রার জন্য বিচার করা নয়, বরং একজন মানুষ হিসেবে তার অধিকার ও মর্যাদাকে সম্মান করাই একটি সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট্য। একইভাবে একজন পুরুষের শক্তি তার কর্তৃত্বে নয়, বরং তার মানবিকতা, ন্যায়বোধ এবং সম্মান প্রদর্শনের সক্ষমতায় প্রকাশ পায়। পরিবারে ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই সমান মর্যাদা, দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার শিক্ষা দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বৈষম্য নয়, সমতার চর্চা করে।
কেএমএএ/আপ্র/১২.৮.২০২৬