আজকের শিশু আগামী দিনের কাণ্ডারি। সেই শিশুরাই একের পর এক নিখোঁজ ও হত্যার শিকার হচ্ছে। অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কে দেশবাসী। সন্তান কোথায়, কেমন আছে, আদৌ ফিরবে কি না- এই উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে দেশের বহু পরিবারের।
সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত ঘটনায় শিশুদের অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যার নির্মম চিত্র সামনে আসায় শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পাবনায় তৃতীয় শ্রেণির স্কুলছাত্রী কামরুন্নাহার কলিকে (১০) ধর্ষণের পর হত্যায় দেশজুড়ে আলোড়ন চলছে। বাড়ির কাছের পরিচিত মুদি দোকানি তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে ডোবায় ফেলে দেয়। কুমিল্লায় ১৩ বছরের শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নিখোঁজের পর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নাড়া দিয়েছে পুরো দেশকে। শুধু আইফোনের জন্য শিশু অপ্রতিমকে হত্যা করে তারই বন্ধুরা- যাদের বয়স ১৫-১৯ বছর। কিছুদিন আগে রাজধানীর হাজারীবাগের ঝাউচর এলাকার একটি বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেনি শিশু আব্দুল্লাহ। এর পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ১২ বছরের শিশু নাঈম অদ্যাবধি নিখোঁজ। তাকে খুঁজতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয় নাঈমের পরিবার। গত ১০ সেপ্টেম্বর জামালপুরের মাদারগঞ্জের সাত বছরের এক শিশু স্কুলে যাওয়ার পথে তার সহপাঠীর বাসায় গেলে সহপাঠীর বাবা শিশুটিকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলে ঘরের মেঝেতে মাটিচাপা দেয়। এ ছাড়া রয়েছে শিশু পাচারকারী চক্র। শিশুদের শেখানো হয় যে, ‘অপরিচিত মানুষের হাত থেকে কোনো কিছু নেবে না বা তার সঙ্গে যাবে না।’ কিন্তু বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটছে পরিচিত ও আত্মীয়স্বজনের দ্বারা।
দেশে গত ৮ মাসে শিশু হত্যা ও ধর্ষণের চিত্র দেখলেই যে কেউ চমকে উঠবে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার তথ্য দিয়েছে পুলিশ। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হলেও এখনও নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ শিশু। গত ৮ মাসে ৩৬ শিশুর লাশ উদ্ধার, এখনও নিখোঁজ ২০৩৮ জন। দেশে গত ৭ মাসে ৬৪১ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার। এর মধ্যে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ২৪১টি। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী এই সাত মাসের পরিসংখ্যান- ৬৪১ জন নারী ও শিশু ধর্ষিত। এর মধ্যে ৪০০ জন নারী ধর্ষণের শিকার। শিশু ধর্ষণের শিকার ২৪১ জন। চলতি সেপ্টেম্বরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মুন অ্যালার্টের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে সারাদেশে ৪৬ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে ১১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এবং চারজনের মরদেহ পাওয়া গেছে। এখনও খোঁজ নেই ৩১ জনের। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যেন দেশে শিশু হত্যার মচ্ছব চলছে।
দেশে শিশুদের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ এক বিবৃতিতে ঘর, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের প্রতিটি পরিসরে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করে। একই সঙ্গে অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা, শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচারপ্রক্রিয়া, স্থানীয় পর্যায়ে সুরক্ষা সেবা এবং মানসিক-সামাজিক সহায়তার ঘাটতি দূর করার কথাও বলা হয়। এ ছাড়া স্কুল, মাদ্রাসা ও কর্মক্ষেত্রেও জবাবদিহি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছে সংস্থাটি। সম্প্রতি নিখোঁজ এবং শিশু হত্যার যে চিত্র এবং পরিসংখ্যান তাতেই বোঝা যায় যে, আমাদের সমাজে শিশুরা নিরাপদ নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশু তার নিজ অভিভাবকের কাছেও নিরাপদ নয়। শিশুদের সঙ্গে যে বা যারা নানাভাবে অপরাধ ও সহিংসতা সৃষ্টি করছে সেসব অভিযুক্তের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি গ্রহণ করা প্রয়োজন। এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যতম দায়িত্ব। নিখোঁজের সঙ্গে বিভিন্ন পেশাদার চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। চক্রগুলো শিশুদের দেশের বাইরে পাচারসহ শিশুর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রি করছে। বিভিন্ন ধরনের জোরজবরদস্তিমূলক কাজে এদের নিয়োজিত করছে। ভিক্ষাবৃত্তিসহ কন্যাশিশুদের বিভিন্ন ধরনের যৌনালয়ে বিক্রি করছে। এই জায়গাগুলোতে চক্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে তাদের শনাক্ত করা এবং আইনগত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শিশু ধর্ষণ কোনো একক ব্যক্তির অপরাধ নয়; বরং এটি সামাজিক কাঠামোর অবক্ষয় ও ত্রুটির ফল। যখন অপরাধীদের বিচার হয় না, নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অভাব থাকে এবং লিঙ্গবৈষম্য প্রবল হয়, তখন অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যায়। সঠিক পারিবারিক শিক্ষা বা সমাজ থেকে যখন শিশুদের বা যুবকদের সঠিক নৈতিক শিক্ষা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ শেখানো হয় না, তখন তারা অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা, নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে সমাজে শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এই জঘন্য অপরাধ রোধ করতে হলে কেবল কঠোর আইনই যথেষ্ট নয়; বরং সমাজ থেকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করা, বুনিয়াদি স্তরে লিঙ্গ ও যৌনতা বিষয়ে সঠিক শিক্ষা দেওয়া এবং পারিবারিক নৈতিকতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।
কেএমএএ/আপ্র/২৫.০৯.২০২৬