চীনের অর্থনীতিকে আমূল বদলে দিয়ে দেশটিকে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত করার পথ তৈরি করা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি মারা গেছেন। বুধবার (১২ আগস্ট) দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। বেইজিংয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্থানীয় সময় সকাল ১১টার দিকে ৯৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ঝু। তবে তারও আগে উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দেশের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, করব্যবস্থার পুনর্গঠন, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে তাঁর নেওয়া পদক্ষেপ চীনের পরবর্তী অর্থনৈতিক উত্থানের ভিত শক্ত করে।
ঝুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যগুলোর একটি ছিল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের সদস্যপদ নিশ্চিত করা। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০০১ সালের ডিসেম্বরে চীন এই সংস্থায় যোগ দেয়। এর ফলে দেশটির বাজার আরো উন্মুক্ত হয় এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে চীনের অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হওয়ার পেছনে এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে দেখা হয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দক্ষ ও লাভজনক করার উদ্যোগে ঝু কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণপ্রাপ্তি সীমিত করা, অদক্ষ প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানা বজায় রেখেই বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে মুনাফামুখী করার নীতি গ্রহণ করেন তিনি। এসব সংস্কারের ফলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক চাকরি হারালেও দীর্ঘমেয়াদে চীনের শিল্প ও অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ে।
১৯৯০-এর দশকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও ঝুর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় কর্মকর্তাদের প্রতিরোধ উপেক্ষা করে তিনি কঠোর আর্থিক নীতি গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে করব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনে কেন্দ্রীয় সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর ব্যবস্থা করেন।
ঝুর নেতৃত্বাধীন সংস্কারের সময় ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বছরে আট শতাংশের বেশি ছিল। ২০০৭ সালে প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছিল। পরবর্তী সময়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়।
তবে তাঁর সংস্কারের সামাজিক মূল্যও কম ছিল না। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কারণে লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারান। আবাসন খাতেও তাঁর সময়ে বড় পরিবর্তন আসে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আবাসন বিক্রির উদ্যোগের ফলে শহরাঞ্চলে ব্যক্তিগত আবাসনের বিস্তার ঘটে।
কঠোর সংস্কারক হলেও ঝু ছিলেন স্পষ্টভাষী ও রসিক নেতা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল কঠোর। একসময় তিনি বলেছিলেন, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য ৯৯টি এবং নিজের জন্য একটি-মোট ১০০টি কফিন প্রস্তুত রেখেছেন।
১৯২৮ সালের ২৩ অক্টোবর হুনান প্রদেশে জন্ম ঝু রংজির। অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও ১৯৫৭ সালে বিদেশের সংস্কারের প্রশংসা করায় তাঁকে ‘ডানপন্থী’ তকমা দেওয়া হয়। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় তাঁকে গ্রামে শারীরিক শ্রমে পাঠানো হয়। ১৯৭৯ সালে পুনর্বাসনের পর দ্রুত রাজনৈতিক উত্থান ঘটে তাঁর।
১৯৮৮ সালে সাংহাইয়ের মেয়র হন ঝু। সেখানে তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা নজর কাড়ে তৎকালীন চীনা নেতৃত্বের। ১৯৯১ সালে উপপ্রধানমন্ত্রী এবং ১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী হন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর জনসমক্ষে তাঁর উপস্থিতি কমে যায়। তবে চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতিকে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার যে রূপান্তর তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তা দেশটির পরবর্তী অর্থনৈতিক উত্থানের অন্যতম ভিত্তি হয়ে আছে। তাঁর মৃত্যুতে চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের ইতিহাসের এক প্রভাবশালী অধ্যায়ের অবসান হলো। সূত্র: এপি, এনবিসি নিউজ
সানা/ডিসি/আপ্র/১২/৮/২০২৬