মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে কিছু অভিযান কেবল বৈজ্ঞানিক সাফল্যের উদাহরণ নয়, মানুষের অদম্য কৌতূহল, প্রকৌশল দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি চিন্তারও অনন্য সাক্ষ্য। প্রায় পাঁচ দশক আগে পৃথিবী ছেড়ে যাত্রা শুরু করা নাসার ভয়েজার ২ তেমনই এক বিস্ময়। বয়সের ভারে এর শক্তি কমে এলেও মহাকাশযানটি এখনো থেমে যায়নি। বরং নতুন কৌশলে শক্তি ব্যবস্থাপনা পুনর্বিন্যাস করে এর বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম আরো এক বছর চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে নাসা।
১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপণের সময় ভয়েজার ২-এ ছিল ১০টি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র। পরিকল্পনা ছিল মূলত বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুনের মতো সৌরজগতের বৃহৎ গ্যাসীয় গ্রহগুলোর রহস্য অনুসন্ধান করা। ১৯৭৯ সালে বৃহস্পতিতে পৌঁছে শুরু হয় তার ঐতিহাসিক অভিযান। পরবর্তী এক দশকে সৌরজগতের চারটি বৃহৎ গ্যাসীয় গ্রহের কাছ দিয়ে উড়ে গিয়ে গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডল, চৌম্বকক্ষেত্র, উপগ্রহ ও বলয় সম্পর্কে এমন সব তথ্য পাঠায়, যা বিজ্ঞানীদের জ্ঞানভান্ডারকে আমূল সমৃদ্ধ করে।
কিন্তু ভয়েজার ২-এর সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত এর পরের অধ্যায়। ২০১৮ সালে এটি সৌরজগতের সুরক্ষাবলয় হেলিওস্ফিয়ারের বাইরে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে প্রবেশ করে। সেখানে সূর্যের প্রভাবমুক্ত অঞ্চলের প্লাজমার ঘনত্ব ও তাপমাত্রাসহ মহাজাগতিক পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য পাঠিয়ে চলেছে। অর্থাৎ মানুষের তৈরি একটি যন্ত্র আজ পৃথিবী থেকে প্রায় অকল্পনীয় দূরত্বে অবস্থান করেও মহাবিশ্বের অজানা প্রান্তের খবর জানাচ্ছে।
তবে এই বিস্ময়যাত্রার সামনে এখন বড় সীমাবদ্ধতা শক্তি। ভয়েজার ২-এর বিদ্যুতের প্রধান উৎস তেজস্ক্রিয় সমস্থানিক তাপবিদ্যুৎ উৎপাদক। এতে থাকা প্লুটোনিয়াম সময়ের সঙ্গে ক্ষয় হচ্ছে। ফলে মহাকাশযানটি প্রতি বছর প্রায় চার ওয়াট করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা হারাচ্ছে। ১৯৭৭ সালের শক্তিশালী মহাকাশযানটি তাই এখন প্রতিটি ওয়াটকে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করছে।
নাসার প্রকৌশলীরা এই বাস্তবতা মাথায় রেখে ‘বিগ ব্যাং’ অভিযানের মাধ্যমে শক্তি ব্যবস্থাপনায় নতুন পরিবর্তন এনেছেন। বেশি বিদ্যুৎ প্রয়োজন এমন কিছু ব্যবস্থা বন্ধ করে কম শক্তি খরচের বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করা হয়েছে। শুধু যন্ত্র সচল রাখাই নয়, মহাকাশযানের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা নিরাপদ রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটি সফল হওয়ায় বর্তমানে কার্যকর থাকা তিনটি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র অন্তত আগামী বছর পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যেতে পারবে।
ভয়েজার ২-এর এই দীর্ঘস্থায়ী যাত্রা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। মহাকাশ গবেষণা কেবল বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। একটি অভিযান কয়েক দশক ধরে কার্যকর রাখতে হলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের জ্ঞানকে কাজে লাগাতে হয়।
ভয়েজার ২ আমাদের আরো একটি সত্য মনে করিয়ে দেয়-মানুষের জ্ঞানসীমা যত দূরই প্রসারিত হোক, অজানার শেষ নেই। পৃথিবী থেকে যাত্রা করা একটি ছোট মহাকাশযান আজ আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে দাঁড়িয়ে মহাবিশ্বের খবর পাঠাচ্ছে। তার প্রতিটি ক্ষীণ সংকেত যেন বলে যাচ্ছে, অনুসন্ধানের ইচ্ছা থাকলে সময়ও মানুষের পথ রোধ করতে পারে না।
প্রায় অর্ধশতক পরও ভয়েজার ২-এর চলমান যাত্রা তাই শুধু একটি মহাকাশযানের টিকে থাকার গল্প নয়; এটি মানুষের স্বপ্ন, বিজ্ঞান ও অধ্যবসায়ের এক অসাধারণ মহাকাব্য।
সানা/ডিসি/আপ্র/১২/৮/২০২৬