অভিনয় জানেন কি না, শুটিংয়ে যেতে হবে কি না-এসব এখন আর বড় বিষয় নয়। শুধু আপনার চেহারাটিই যদি কারও পছন্দ হয়, সেটি দিয়েই তৈরি হতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চরিত্র। বিজ্ঞাপন, স্বল্পদৈর্ঘ্য নাটক, ভিডিও গেমসহ নানা ডিজিটাল কনটেন্টে সেই চরিত্র অভিনয় করবে। আর বিনিময়ে নিজের চেহারার ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে আয় করতে পারবেন আপনি। চীনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের সঙ্গে তৈরি হয়েছে এমনই এক অভিনব আয়ের বাজার।
হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে গালফ নিউজ জানিয়েছে, চীনে সাধারণ মানুষ এখন ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতাদের কাছে নিজেদের চেহারা ব্যবহারের অধিকার দিচ্ছেন। একবার কোনো ব্যক্তির চেহারার ডিজিটাল প্রতিরূপ তৈরি করা হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সেই চেহারা ব্যবহার করে বিভিন্ন দৃশ্যের ভিডিও তৈরি করা সম্ভব। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রতিটি শুটিংয়ে উপস্থিত থাকতে হয় না।
চীনের বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এখন এমন মানুষদের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কনটেন্ট নির্মাতাদের যোগাযোগ করিয়ে দিচ্ছে, যারা নিজেদের চেহারা ব্যবহারের অনুমতি দিতে আগ্রহী। চেহারা কী ধরনের কাজে ব্যবহার করা হবে, কতদিন ব্যবহার করা যাবে এবং চুক্তির অন্যান্য শর্ত কী - এসবের ওপর নির্ভর করে পারিশ্রমিক নির্ধারিত হচ্ছে। প্রতিবেদনে সর্বোচ্চ প্রায় ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত পারিশ্রমিকের বিজ্ঞাপন দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এই অঙ্ককে সাধারণ আয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; অধিকাংশ লেনদেনে পারিশ্রমিক এর তুলনায় অনেক কম।
এর একটি উদাহরণ ২৭ বছর বয়সী ব্যাংক কর্মকর্তা হুয়াং। বাড়তি আয়ের আশায় তিনি অনলাইনে নিজের চেহারা ব্যবহারের অধিকার দেওয়ার বিজ্ঞাপন দেন। মাত্র তিন দিনের মধ্যে তাঁর ডিজিটাল চেহারা সাতবার ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত হয়। এতে তিনি প্রায় দুই হাজার ছয়শ ইউয়ান, অর্থাৎ প্রায় ৩৭০ ডলার আয় করেন।
চীনে এই নতুন বাজারের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি স্বল্পদৈর্ঘ্য নাটকের দ্রুত বিস্তার। এসব নাটকে প্রতিটি দৃশ্যের জন্য আলাদা অভিনেতা, শুটিং, পোশাক ও সেটের প্রয়োজন কমে যায়। কোনো ব্যক্তির চেহারা ব্যবহারের অনুমতি পাওয়া গেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সেই চেহারাকে বিভিন্ন চরিত্র ও পরিবেশে ব্যবহার করা যায়। পোশাক, পটভূমি, অঙ্গভঙ্গি এমনকি সংলাপও প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবর্তন করা সম্ভব।
চীনের স্বল্পদৈর্ঘ্য নাটকের বাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে দেশটিতে প্রকাশিত প্রায় এক লাখ ২৮ হাজার স্বল্পদৈর্ঘ্য নাটকের ৯৫ শতাংশের বেশি কোনো না কোনো পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বাস্তব মানুষের চেহারাকে ডিজিটাল চরিত্রে ব্যবহারের চাহিদাও তৈরি হয়েছে।
তবে চেহারা ভাড়া দেওয়ার এই নতুন আয়ের পথের সঙ্গে ঝুঁকিও কম নয়। একজন মানুষ নিজের চেহারা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার পর সেটি কোথায়, কী ধরনের কনটেন্টে এবং কতদিন ব্যবহার করা হবে - চুক্তির শর্তে এসব বিষয় স্পষ্ট না থাকলে ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় ব্যক্তিগত পরিচয়, মুখমণ্ডলের তথ্য, সম্মতি এবং অনুমোদনের বাইরে পুনর্ব্যবহারের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চীনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কনটেন্টের ওপর নিয়ন্ত্রণও জোরদার হচ্ছে। নতুন নিয়মে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি স্বল্পদৈর্ঘ্য নাটকে যথাযথ পরিচিতি দেওয়ার পাশাপাশি নির্মাতাদের মানুষের চেহারা বা কণ্ঠ ব্যবহারের অনুমতি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু অভিনয়ের ধরনই বদলাচ্ছে না, মানুষের চেহারাকেও পরিণত করছে নতুন ধরনের ডিজিটাল সম্পদে। কারও জন্য এটি হতে পারে বাড়তি আয়ের সুযোগ, আবার কারও জন্য হতে পারে ব্যক্তিগত পরিচয় ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর নতুন ঝুঁকি। প্রযুক্তির এই নতুন বাজারে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু ‘চেহারার দাম কত’ নয় - বরং নিজের চেহারার ওপর শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ কার থাকবে। সূত্র: গালফ নিউজ; সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।
সানা/ডিসি/আপ্র/২৯/৯/২০২৬