বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী শিশুরা। অথচ রাষ্ট্রপ্রধানের ভাষণ, বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থার প্রচার কিংবা আন্তর্জাতিক দিবসের প্রতিপাদ্য- প্রায় সর্বত্রই ‘শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ’ বাক্যটি উচ্চারিত হয়। কেউ যখন একটি শিশুকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পেটায়, তখন সে জাতির ভবিষ্যৎকে পেটায়; কেউ যখন একটি শিশুর গায়ে আগুনের ছ্যাঁকা দেয়, সে আসলে জাতির ভবিষ্যতের গায়ে ছ্যাঁকা দেয়; যে শিশুকে ছাদ থেকে ছুড়ে ফেলে মারে, সে জাতির ভবিষ্যৎকে ছুড়ে ফেলে। যারা কোনো শিশুর পায়ুপথে হাওয়া ঢুকিয়ে পেট ফুলিয়ে মেরে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে, তারা জাতির ভবিষ্যতের পেট ফুলিয়ে উল্লাসে মাতে। এসবই বাঙালি জাতির সবচেয়ে নির্যাতিত ভবিষ্যৎ। এ বিষয় নিয়েই এবারের নারী ও শিশু পাতার প্রধান ফিচার
শিশু ঠিক কখন ‘ভবিষ্যৎ’ হয়ে যায়! জন্মের পর? বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর? নাকি বড় হয়ে কর্মজীবনে প্রবেশের পর? প্রশ্নটি অদ্ভুত মনে হতে পারে। কারণ আমরা ছোটবেলা থেকেই একটি বাক্য শুনে আসছি- ‘শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ’। এর উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। সমাজকে শিশুদের প্রতি আরও দায়িত্বশীল করাই এর লক্ষ্য। কিন্তু যে শিশু আজ ক্ষুধার্ত, আজ নির্যাতনের শিকার, আজ যুদ্ধ ও দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত, আজ দূষিত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে, আজ হাসপাতালের শয্যায় চিকিৎসার অপেক্ষায়, আজ শিক্ষাবঞ্চিত সে কীভাবে ‘ভবিষ্যৎ’ হয়? সে তো আজ বেঁচে আছে। আজ তার অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। আজ তার নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, পুষ্টি, খেলাধুলা ও সুরক্ষা দরকার। তার জীবন বর্তমান কালে ঘটে; ভবিষ্যৎ কালে নয়।
আমরা যেভাবে মানুষকে সংজ্ঞায়িত করি, রাষ্ট্র ও সমাজও ধীরে ধীরে সেভাবেই তার প্রতি নিজেদের দায়িত্ব এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে। যদি শিশুকে প্রধানত ‘ভবিষ্যৎ’ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তার বর্তমান অধিকার কি অনিচ্ছাকৃতভাবে গুরুত্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে? যদি তার পরিচয়ই হয় ‘আগামী দিনের নাগরিক’, তাহলে আজকের নাগরিক হিসেবে তার দাবি কি আমাদের নীতিনির্ধারণে যথেষ্ট জোর পায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার দর্শন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের সামনে দাঁড় করায়।
শিশু তার মা-বাবার সম্পত্তি নয়, রাষ্ট্রের সম্পদ নয় কিংবা কেবল ‘বড় হয়ে উঠতে থাকা মানুষ’ও নয়; একজন পূর্ণ মানবসত্তা, যার নিজস্ব অধিকার আছে। এই অধিকার তাকে ভবিষ্যতে অর্জন করতে হবে না; জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই তা তার প্রাপ্য। শিশু-সম্পর্কিত প্রতিটি সিদ্ধান্তে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থই হবে প্রধান বিবেচ্য। অথচ এখানে কোথাও ‘ভবিষ্যতের স্বার্থ’কে প্রধান বিবেচনা করতে বলা হয়নি। বলা হয়েছে, আজ যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে- এই সিদ্ধান্তে আজকের শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। হাসপাতাল নির্মাণ থেকে শুরু করে আদালতের রায়, বিদ্যালয়ের নীতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কিংবা আইন প্রণয়ন- সব ক্ষেত্রেই শিশুর বর্তমান কল্যাণ কেন্দ্রে রাখার নির্দেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক আইন।
ভাষা শুধু কোনো বাস্তবতাকে প্রকাশ করে না, অগ্রাধিকারও তৈরি করে। আমরা যাকে যেভাবে দেখি, নীতিও ধীরে ধীরে তাকে সেভাবেই দেখতে শেখে। এ কারণেই আমাদের শিশু-সম্পর্কিত ভাষাকেও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। এখানেই ভাষার প্রশ্নটি রাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে পরিণত হয়। সমাজবিজ্ঞান, আইন ও জননীতি- তিনটি ক্ষেত্রেই একটি বিষয় বহুল স্বীকৃত, ভাষা শুধু বাস্তবতাকে বর্ণনা করে না; ভাষা বাস্তবতাকে বোঝার কাঠামোও তৈরি করে। আমরা যেভাবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সংজ্ঞায়িত করি, রাষ্ট্রও ধীরে ধীরে সেই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতেই তার অগ্রাধিকার, নীতি ও বিনিয়োগের যুক্তি নির্মাণ করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ’ বাক্যটিকে নতুন করে দেখা দরকার।
যখন শিশুর পরিচয় প্রধানত ‘ভবিষ্যৎ’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন ঝুঁকি তৈরি হয়- শিশুর মূল্যায়ন তার বর্তমান মানবিক মর্যাদার পরিবর্তে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ভিত্তিতে হতে শুরু করে। অর্থাৎ সে বড় হয়ে দক্ষ কর্মী হবে, অর্থনীতিতে অবদান রাখবে, রাষ্ট্রের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে-এই সম্ভাবনাগুলোই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। অথচ আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার দর্শন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অবস্থান গ্রহণ করে। সেখানে শিশুর মূল্য তার সম্ভাবনায় নয়; তার অস্তিত্বে। সে আজ একজন মানুষ বলেই তার অধিকার আছে। তার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য ভবিষ্যতের কোনো অর্থনৈতিক বা সামাজিক লাভের যুক্তি দেখানোর প্রয়োজন নেই।
ভবিষ্যতের জন্য প্রতিশ্রুতি দেওয়া তুলনামূলক সহজ। বলা সহজ-‘আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য সুন্দর বাংলাদেশ গড়ব।’ কিন্তু আজকের শিশুর জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য বাজেট বরাদ্দ করা, প্রতিটি হাসপাতালে শিশুবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা, নিরাপদ সড়ক নির্মাণ করা, খেলার মাঠ সংরক্ষণ করা, দূষণ কমানো, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কিংবা নির্যাতনের শিকার শিশুর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা অনেক কঠিন। তাই ‘ভবিষ্যৎ’ শব্দটি কখনো কখনো বর্তমানের জরুরি দায়বদ্ধতাকে পিছিয়ে দেওয়ার একটি আরামদায়ক ভাষায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাস্তবতা আমাদের বারবার এই কথাই মনে করিয়ে দেয়।
শিশু ভবিষ্যতে অপুষ্টির শিকার হয় না; আজ হয়। ভবিষ্যতে যুদ্ধের কারণে উদ্বাস্তু হয় না; আজ হয়। ভবিষ্যতে বায়ুদূষণে ফুসফুসের ক্ষতি হয় না; আজ হয়। ভবিষ্যতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় না; আজ হারায়। ভবিষ্যতে নির্যাতনের শিকার হয় না; আজ হয়। তার প্রতিটি আনন্দ যেমন বর্তমানের, তেমনি প্রতিটি বঞ্চনা ও যন্ত্রণাও বর্তমানের। তাই শিশু সম্পর্কে আমাদের সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি হওয়া উচিত- সে বড় হয়ে কী হবে, তা নয়; বরং আজ কেমন আছে।
একটা রাষ্ট্র যদি শিশুকে প্রধানত ভবিষ্যতের মানবসম্পদ হিসেবে দেখে, তাহলে শিশুতে বিনিয়োগের প্রধান যুক্তি হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের লাভ। কিন্তু একটি অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র শিশুকে বর্তমানের মানুষ হিসেবে দেখে। সেখানে শিশুর নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অংশগ্রহণ ও মর্যাদা কোনো ভবিষ্যৎ লাভের কারণে নয়; সেগুলো তার জন্মগত মানবাধিকার বলেই নিশ্চিত করা হয়। সম্ভবত এখানেই ‘শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ’ বাক্যটির সীমাবদ্ধতা। এটা ভুল নয়, কিন্তু এটা শিশুর একটি পরিচয়কে সামনে আনে, আরেকটি পরিচয়কে আড়াল করে। শিশু ভবিষ্যতের নাগরিক অবশ্যই; কিন্তু তার আগে সে বর্তমানের একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ।
‘শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ’ বাক্যটি ভুল নয়। কিন্তু এটি অসম্পূর্ণ। কারণ এটা শিশুর ভবিষ্যৎ পরিচয়কে সামনে আনে, বর্তমান পরিচয়কে নয়। অথচ আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার দর্শন আমাদের ভিন্ন একটি শিক্ষা দেয়। যদি আমরা সত্যিই শিশুকে বর্তমানের মানুষ হিসেবে স্বীকার করি, তাহলে শিশু আর কেবল শিশু মন্ত্রণালয় বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিষয় থাকবে না। হাসপাতাল নির্মাণ, নগর পরিকল্পনা, গণপরিবহন, সড়ক নিরাপত্তা, জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, বিচারব্যবস্থা, ডিজিটাল নিরাপত্তা কিংবা জাতীয় বাজেট-রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রথম প্রশ্নটি হওয়া উচিত, এই সিদ্ধান্ত শিশুর ওপর কী প্রভাব ফেলবে? এটাই আসলে শিশু অধিকার সনদের ‘শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ’ নীতির বাস্তব প্রয়োগ।
ভাষা শুধু চিন্তা প্রকাশ করে না; ভাষা চিন্তার দিকও নির্ধারণ করে। আমরা যদি প্রতিনিয়ত শিশুকে প্রধানত ‘ভবিষ্যৎ’ বলে দেখি, তাহলে তার বর্তমানের জরুরি চাহিদা অগ্রাধিকারের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। কিন্তু যদি আমরা তাকে প্রথমেই বর্তমানের একজন মানুষ হিসেবে দেখি, তাহলে তার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মর্যাদা ও অংশগ্রহণ আর ভবিষ্যতের বিনিয়োগ নয়; সেগুলো রাষ্ট্রের অবিলম্বে পালনীয় দায়িত্বে পরিণত হয়। তাই হয়তো সময় এসেছে বহুল ব্যবহৃত বাক্যটিকে নতুনভাবে উচ্চারণ করার। শিশু শুধু জাতির ভবিষ্যৎ নয়; শিশু জাতির বর্তমান। কারণ ভবিষ্যৎ কোনো দূরবর্তী সময়ে জন্ম নেয় না। ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে আজকের শিশুর নিরাপত্তায়, আজকের শিশুর শিক্ষায়, আজকের শিশুর সুস্বাস্থ্যে, আজকের শিশুর মর্যাদায় এবং আজকের শিশুর অধিকার সুরক্ষায়।
কেএমএএ/আপ্র/১২.৮.২০২৬