গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

নারী-শিশুর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:১৪ পিএম, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২২:৩৩ এএম ২০২৬
নারী-শিশুর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের
ছবি

ছবি সংগৃহীত

নারী নিজের ঘরেও সহিংসতার শিকার হলে তিনি কোথায় নিরাপদ নন। নিরাপত্তা শুধু রাস্তাঘাট, কর্মক্ষেত্র বা গণপরিবহনের নয়; নারীর নিজের ঘর, তার শরীর, তার মর্যাদা ও তার ব্যক্তিগত পরিসরও নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার আওতায় পড়ে। কারণ নিরাপত্তা কোনো অনুগ্রহ নয়, নাগরিকের মৌলিক অধিকার। ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ এবং তার ১৪ বছর বয়সি ছেলেকে বেঁধে রাখার ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী ডাকাতির সময় ওই নারীকে তার সন্তানের সামনে যৌন সহিংসতার শিকার হতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, ঘটনার ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবির অভিযোগও উঠেছে। এ বিষয় নিয়েই এবারের নারী ও শিশু পাতার প্রধান ফিচার

ঘটনাটি তদন্তাধীন এবং অভিযোগের সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। কিন্তু অভিযোগের ভয়াবহতা এমন যে এটি কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত মর্যাদা, রাষ্ট্রের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব এবং আমাদের বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে।

বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের সমতা, আইনের আশ্রয় এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষাকে মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। ২৮ অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের সুরক্ষা পাওয়াকে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনও নারী যখন সহিংসতার শিকার হন, তখন তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু পুলিশের প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়ও যুক্ত। এই দায় অপরাধ সংঘটনের পর অপরাধী গ্রেফতার করার মধ্যেই শেষ হয় না। অপরাধ প্রতিরোধ, ঝুঁকি শনাক্ত করা, দ্রুত প্রতিকার, নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায়বিচার এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা- সবকিছুই রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার অংশ।

ধর্ষণের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ধারা ৯ অনুযায়ী কোনও নারী বা শিশুকে ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ২০২৬ সালের সংশোধনের পরও এই মূল শাস্তির বিধান বহাল রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কঠোর শাস্তির বিধান কি এককভাবে নারীকে নিরাপদ করতে পারে?

একটি আইনের শক্তি শুধু তার শাস্তির মাত্রায় নয়; তার প্রয়োগ কতা নিশ্চিত, দ্রুত ও ন্যায়সংগত- তার ওপরও আইনের কার্যকারিতা নির্ভর করে। অপরাধী জানবে যে অপরাধ করলে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে, তদন্তে প্রভাব বিস্তার বা আলামত নষ্ট করার সুযোগ থাকবে না, বিচারপ্রক্রিয়া অযথা দীর্ঘ হবে না এবং ভুক্তভোগীকে ভয় দেখিয়ে মামলা থেকে সরিয়ে দেওয়া যাবে না- এই আস্থাই অপরাধ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

গফরগাঁওয়ের অভিযোগে ১৪ বছর বয়সি শিশুটির বিষয়টিও বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। একজন সন্তানকে বেঁধে রেখে তার মায়ের ওপর যৌন সহিংসতা চালানোর অভিযোগ শুধু ওই নারীর ওপর নয়, শিশুটির ওপরও গভীর সহিংসতা। সে নিজে শারীরিকভাবে আক্রান্ত  হয়ে এমন দৃশ্যের প্রত্যক্ষদর্শী হওয়া তার মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শিশুটিকে শুধু শারীরিক নির্যাতনের শিকার হিসেবে দেখলে চলবে না—তাকে একজন ট্রমা-ভুক্তভোগী হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। তার নিরাপত্তা, মানসিক সহায়তা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তার পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখা জরুরি।

একটি শিশুর জীবনের ওপর একটি রাতের ভয়াবহতা যেন সারা জীবনের সামাজিক পরিচয় হয়ে না দাঁড়ায়- এ দায়িত্ব পরিবার, রাষ্ট্র এবং গণমাধ্যম সবার। এই ঘটনায় আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে এসেছে- ভিডিও ধারণ এবং তা প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবি। প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে যৌন সহিংসতার একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। শারীরিক সহিংসতার পর ডিজিটাল মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে আবারও ভয় দেখানো, ব্ল্যাকমেইল করা বা সামাজিকভাবে অপমানের হুমকি দেওয়া এক ধরনের দ্বিতীয় দফার নির্যাতন।

বর্তমান সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর ২৫ ধারায় ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়ন সংক্রান্ত উপাদান বা সেক্সটর্শনের উদ্দেশ্যে কোনও ভিডিও, ছবি বা অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ, প্রচার কিংবা প্রকাশের হুমকিকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কোনও নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সি শিশুর বিরুদ্ধে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে শাস্তির মাত্রাও বেশি। ফলে অভিযোগ অনুযায়ী ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবি করার বিষয়টিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। তবে এখানে শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্বের কথা বললেই হবে না। আমাদের সামাজিক আচরণও গুরুত্বপূর্ণ।

কোনও নারী নির্যাতনের শিকার হলে তার ছবি, ভিডিও, পরিচয় বা ব্যক্তিগত তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া একেবারেই বন্ধ করতে হবে। ‘খবর’ ছড়িয়ে দেওয়ার নামে কোনও ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন  করার অধিকার কারও নেই। গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও বেশি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ১৪ ধারায় এমনভাবে সংবাদ বা তথ্য প্রকাশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যাতে নির্যাতনের শিকার নারী বা শিশুর পরিচয় প্রকাশ পায়। আইনটি সংবাদপত্রের পাশাপাশি অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রেও এই সুরক্ষা প্রযোজ্য করেছে। তাই কোনও ঘটনা যতই ভয়াবহ হোক, সংবাদ পরিবেশনের সময় ভুক্তভোগীর পরিচয়, ছবি, ঠিকানা, সন্তানের পরিচয় কিংবা এমন কোনও তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়; যা তাদের সহজে শনাক্ত করতে পারে। অপরাধের ভয়াবহতা তুলে ধরা এবং ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা রক্ষা-দুটিকে একসঙ্গে করা সম্ভব। বরং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হলো এই ভারসাম্য রক্ষা করা।

প্রতিটি অপরাধের পর গ্রেফতার ও বিচার জরুরি। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু প্রতিক্রিয়াশীল হওয়া নয়; প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও গড়ে তোলা। স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধপ্রবণতা, সংঘবদ্ধ অপরাধীদের গতিবিধি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা, রাতের নিরাপত্তা, পুলিশের টহল ও গোয়েন্দা তৎপরতা- এসব নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কোনও এলাকায় বারবার অপরাধের ঘটনা ঘটলে সেটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে বৃহত্তর নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখা দরকার।

আইনে অধিকার আছে, শাস্তির বিধান আছে, সাংবিধানিক সুরক্ষা আছে। কিন্তু একজন নারী যদি নিজের ঘরেও নিরাপদ না থাকেন, যদি একটি শিশু তার মায়ের ওপর সহিংসতার সঙ্গে নিজেও নির্যাতনের শিকার  হতে  হয়, যদি অপরাধের ভিডিও দিয়ে আবারও ভুক্তভোগীকে ভয় দেখানো যায়; তাহলে শুধু আইনের অস্তিত্ব দিয়ে আমাদের দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রয়োজন আইনের কার্যকর প্রয়োগ, পেশাদার তদন্ত, দ্রুত বিচার, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং অপরাধ প্রতিরোধে আরও শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। একইসঙ্গে প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক মানসিকতা, যেখানে ধর্ষণের শিকার নারীকে প্রশ্ন করা হবে না; প্রশ্ন করা হবে অপরাধীকে। যেখানে একটি শিশুর ট্রমাকে কৌতূহলের বিষয় নয়, আইনগত ও মানবিক সহায়তার বিষয় হিসেবে দেখা হবে। যেখানে প্রযুক্তি অপরাধীর হাতিয়ার না হয়ে মানুষের নিরাপত্তার মাধ্যম হবে।

নারীর নিরাপত্তা কোনও বিশেষ সুবিধা নয়; তার নাগরিক অধিকার, মানবিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই গফরগাঁওয়ের এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ বিচার যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি সেই ব্যবস্থাগুলো খুঁজে বের করা, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে আর কোনও নারীকে তার নিজের ঘরেও এমন ভয়াবহতার মুখোমুখি হতে না হয়।

কেএমএএ/আপ্র/১০.০৯.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

শিশুর আশ্রয়স্থল পরিচিত মানুষের কাছেই বেশি নির্যাতনের শিকার
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিশুর আশ্রয়স্থল পরিচিত মানুষের কাছেই বেশি নির্যাতনের শিকার

শিশুর নিরাপদ শৈশবের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হওয়ার কথা পরিবার ও পরিচিত পরিসর। অথচ ওই পরিচিত গণ্ডির মধ্যেই যখন...

‘আসসালামু আলাইকুম’, ‘ইনশাআল্লাহ’ বলায় সমালোচিত নারী আইপিএস
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘আসসালামু আলাইকুম’, ‘ইনশাআল্লাহ’ বলায় সমালোচিত নারী আইপিএস

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডি কেন্দ্র করে বিতর্কের মধ্যে নারী আইপিএস...

কিশোর-কিশোরীকে শেখাতে হবে ভালো-খারাপ বন্ধুর পার্থক্য
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কিশোর-কিশোরীকে শেখাতে হবে ভালো-খারাপ বন্ধুর পার্থক্য

উঠতি বয়স এমন একটি সময়- যখন সন্তান ধীরে ধীরে পরিবার থেকে নিজের আলাদা একটি জগৎ তৈরি করতে শুরু করে। এই...

কোনো শিশুই শিক্ষার বাইরে থাকবে না: শিশুবিষয়ক মন্ত্রী
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কোনো শিশুই শিক্ষার বাইরে থাকবে না: শিশুবিষয়ক মন্ত্রী

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু হোক কিংবা স্বাভাবিক শিশু, কোনো শিশুকেই শিক্ষার বাইরে রাখা হবে না বলে জানিয়ে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বাস ভাড়া বাড়লো কিলোমিটারে ১৭ পয়সা, প্রজ্ঞাপনের আগেই বাড়তি আদায়

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির আগেই রাজধানীসহ বিভিন্ন রুটে বাসভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন পরিবহনকর্মীদের কেউ কেউ। কোথাও ১০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা, কোথাও প্রতি স্টপেজে পাঁচ টাকা করে বেশি নেওয়া হচ্ছে। দূরপাল্লার বাসেও গন্তব্যভেদে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অথচ সরকার ও সড়ক পরিবহন মালিকপক্ষ প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন বাস ভাড়ার এই নৈরাজ্য সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে?

মোট ভোট: ০ | শেষ আপডেট: 21 ঘন্টা আগে