একটা সময় অনেক মেয়ের পড়াশোনা থেমে যেত মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকের পরই। এখন সময় বদলেছে। একুশ শতকের বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান, গবেষণাগার কিংবা বিদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারীর উপস্থিতি এখন আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় দৃশ্যমান। কিন্তু সংখ্যার এই অগ্রগতি সত্ত্বেও উচ্চশিক্ষায় নারীর পথ এখনো পুরোপুরি মসৃণ নয়। পারিবারিক বাধা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা নিরাপত্তার চিন্তায় আজও উচ্চশিক্ষা যেন নারীর জন্য অনেকটাই স্বপ্নের মতো। উচ্চশিক্ষা নারীর চিন্তাজগৎ প্রসারিত করে, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি ও নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করে। পরিবার ও সমাজে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন শিক্ষিত নারী। তবে নারীর উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধির পেছনে পরিবারের মানসিকতার পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ বিষয় নিয়েই এবারের নারী ও শিশু পাতার প্রধান ফিচার
অনেক মা-বাবা এখন মেয়েকে শুধু বিয়ে দেওয়ার জন্য নয়, বরং স্বাবলম্বী ও আত্মনির্ভরশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান। সরকারি-বেসরকারি বৃত্তি, উপবৃত্তি ও বিভিন্ন শিক্ষা সহায়তার সুযোগও উচ্চশিক্ষায় নারীর প্রবেশ সহজ করেছে। চিকিৎসা, প্রকৌশল, কৃষি, প্রযুক্তি, গবেষণা কিংবা সামাজিক বিজ্ঞানের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষায় নারীর ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। তবুও উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়লেও অনেক মেয়েকে এখনও সামাজিক ও পারিবারিক প্রত্যাশার সঙ্গে লড়াই করতে হয়। বিয়ের চাপ, আর্থিক সংকট, দূরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও আবাসনের সমস্যা অনেক সময় পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কারও কারও ক্ষেত্রে বিয়ের পর সংসার ও সন্তান পালনের দায়িত্বের কারণে উচ্চশিক্ষা থেমে যায়। এছাড়া ‘কিছু বিষয় মেয়েদের জন্য নয়’ এমন প্রচলিত ধারণাও নারীর পছন্দ ও আত্মবিশ্বাসকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানোই যথেষ্ট নয়, পড়াশোনা শেষ করা এবং গবেষণা ও কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
নারীর উচ্চশিক্ষায় পরিবারের ভাবনা একদিকে যেমন প্রগতিশীল ও ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে ধাবিত হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি এখনও কিছু সনাতনী সামাজিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার বৃত্তে বন্দি রয়েছে। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ ২০২৪ সালে এসে ৫০.৪১ শতাংশে উন্নীত হলেও, পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মনস্তত্ত্বিক সমর্থন এখনও একটি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। নারীর উচ্চশিক্ষার পথকে মসৃণ করতে হলে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সৃষ্টি করলেই হবে না, বরং পরিবারের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা সবচেয়ে জরুরি।
নারীর উচ্চশিক্ষায় অগ্রগতি ও সম্ভাবনা: আর্থিক নিরাপত্তা ও স্বাবলম্বিতা কত জরুরি তা আধুনিক পরিবারগুলো বুঝতে পারছে। কেবল ছেলেদের ওপর নির্ভর না করে কন্যাসন্তানকেও উচ্চশিক্ষিত করার দিকে ঝুঁকছে, যাতে তারা ভবিষ্যৎ জীবনে আর্থিক স্বাধীনতা ও স্বাবলম্বিতা অর্জন করতে পারে। একটি শিক্ষিত মা একটি আদর্শ জাতি গঠন করতে পারে- এই ধারণা এখন পরিবারগুলোতে বেশ সুদৃঢ়। শিক্ষিত নারীকে এখন পরিবারের একটি ‘সুরক্ষিত দুর্গ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়- যা সংকটের সময়ে পরিবারকে আগলে রাখতে পারে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬০ শতাংশ নারী শিক্ষক কোটার মতো সরকারি সুযোগ-সুবিধা এবং করপোরেট সেক্টরে নারীদের ক্রমবর্ধমান সাফল্যের কারণে অনেক পরিবারই মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় আগ্রহ দেখাচ্ছে।
সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ: বিয়ে নিয়ে সামাজিক চাপ আজও বিদ্যমান। অনেক পরিবার এখনও মনে করে উচ্চশিক্ষা মেয়েদের বিয়ের বয়স বাড়িয়ে দেয়। সমাজ ও আত্মীয়স্বজনদের চাপে অনেক সময় স্নাতক বা স্নাতকোত্তর শেষ করার আগেই, কখনও কখনও মেয়েদের বাল্যবিয়ে বা জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া হয়। গ্রামীণ এবং কিছু মধ্যবিত্ত পরিবারে এখনও মনে করে যে, মেয়েরা তো পরের বাড়ি চলে যাবে- এই মানসিকতা বা প্রচলিত ধারণার ফলে মেয়েদের পেছনে উচ্চশিক্ষার ব্যয় অর্থহীন, কারণ বিয়ের পর তার আয়ের সুফল পাবে শ্বশুরবাড়ি। এর ফলে ছেলেদের শিক্ষার পেছনে বেশি বিনিয়োগ করা হয়। উচ্চশিক্ষার জন্য মেয়েদের ঢাকার মতো বড় শহরে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো নিয়ে অনেক অভিভাবক নিরাপত্তা, সামাজিক কুসংস্কার এবং হল বা আবাসন সংকটের কারণে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগেন। বিয়ের পর অধিকাংশ পরিবারেই পুত্রবধূর পড়াশোনার চেয়ে গৃহস্থালি কাজ এবং সন্তান লালন-পালনকে অগ্রাধিকার দেয়, যা নারীর উচ্চশিক্ষার পথে বড় মনস্তাত্ত্বিক বাধা সৃষ্টি করে।
ভাবনার সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে নারীর উচ্চশিক্ষা বিষয়ে পরিবারগুলোর সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। ঘরের কাজ এবং শিক্ষা বা ক্যারিয়ার কেবল নারীর একার নয়, বরং পরিবারের সবার যৌথ সহযোগিতার বিষয়- এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আনা। উচ্চশিক্ষা একটি পরিবার ও সমাজে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গড়ে তোলে এবং নারীদের তাদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে। একজন নারী যখন উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে নিজের অবস্থান তৈরি করেন, তখন তার সাফল্য শুধু তার নিজের নয়, পরবর্তী প্রজন্মের মেয়েদের জন্যও পথ দেখায়। তাই নারীর উচ্চশিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি বৈষম্যহীন, আত্মনির্ভর ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ার অন্যতম ভিত্তি।
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১১.২৬