শিশুরা কখনো এমন কারো সঙ্গে কথা বলে, যাকে পরিবারের অন্য কেউ দেখতে পায় না। কখনো কাল্পনিক বন্ধুর জন্য খাবার রাখতে বলে, কখনো তার সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠে, আবার কখনো মনের কথাও ভাগ করে নেয় সেই অদৃশ্য সঙ্গীর সঙ্গে। এমন আচরণ দেখে অনেক অভিভাবক চিন্তায় পড়ে যান। তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগে, এটি কি শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার অংশ, নাকি উদ্বেগের কোনো কারণ রয়েছে?
শিশুর কাল্পনিক বন্ধু তৈরির প্রবণতা সাধারণত শৈশবের কল্পনাপ্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত। মনোবিজ্ঞান ও শিশুবিকাশের আলোচনায় এটি পরিচিত একটি বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে কাল্পনিক বন্ধু শিশুর সৃজনশীলতা, ভাষার দক্ষতা, আবেগ প্রকাশ এবং সামাজিক পরিস্থিতি বোঝার অনুশীলনে ভূমিকা রাখতে পারে।
কল্পনার জগতে তৈরি হয় বন্ধুত্ব
শিশুর কাল্পনিক বন্ধু সব সময় অদৃশ্য কোনো চরিত্র হয় না। কখনো পুতুল, খেলনা কিংবা নরম খেলনাকেও শিশু নিজের বিশেষ বন্ধু হিসেবে কল্পনা করতে পারে। তার সঙ্গে কথা বলা, গল্প তৈরি করা কিংবা নানা পরিস্থিতিতে একসঙ্গে থাকার অভিনয়—এসবই কল্পনাভিত্তিক খেলার অংশ।
শিশুবিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বন্ধুত্ব অনেক শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের অংশ। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের তথ্য অনুযায়ী, কাল্পনিক বন্ধুর সঙ্গে খেলার মাধ্যমে শিশুরা সামাজিক আচরণ অনুশীলন করতে এবং চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া শিখতে পারে।
ভাষা ও গল্প বলার দক্ষতা বাড়াতে পারে
কাল্পনিক বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার সময় শিশু নিজের মতো করে গল্প তৈরি করে, প্রশ্ন করে, উত্তর দেয় এবং নানা ঘটনা বর্ণনা করে। এভাবে সে নতুন শব্দ ব্যবহার, বাক্য গঠন ও নিজের ভাবনা প্রকাশের অনুশীলন করতে পারে।
২০০৯ সালে ‘আর্লি চাইল্ডহুড রিসার্চ কোয়ার্টারলি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, কাল্পনিক বন্ধু রয়েছে এমন কিছু শিশু গল্পের বই ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে তুলনামূলক সমৃদ্ধ বর্ণনা দিতে পেরেছে। তবে এ ফলাফল থেকে বলা যায় না যে কাল্পনিক বন্ধু থাকলেই প্রত্যেক শিশুর ভাষাগত দক্ষতা বাড়বে।
সাধারণত তিন থেকে সাত বছর বয়সের মধ্যে কাল্পনিক বন্ধু তৈরির প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এ সময় শিশুর কল্পনাশক্তি ও ভাষার দক্ষতা দ্রুত বিকশিত হতে থাকে।
আবেগ বোঝা ও প্রকাশের সুযোগ
শিশুরা সব সময় নিজেদের ভয়, আনন্দ, দুঃখ কিংবা রাগ সরাসরি প্রকাশ করতে পারে না। কাল্পনিক বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথন বা অভিনয়ের মাধ্যমে তারা কখনো এসব অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ পায়।
যেমন, কোনো শিশু তার কাল্পনিক বন্ধুকে বলতে পারে যে সে স্কুলে যেতে ভয় পাচ্ছে। আবার বন্ধুটির মন খারাপ হয়েছে কল্পনা করে তাকে সান্ত্বনাও দিতে পারে। এ ধরনের খেলায় শিশু বিভিন্ন আবেগ নিয়ে ভাবতে এবং সেগুলোর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া কল্পনা করতে পারে।
কাল্পনিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষণায় এ ধরনের খেলাকে আবেগ ও সামাজিক অভিজ্ঞতা অনুশীলনের সম্ভাব্য একটি ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়েছে।
সামাজিক দক্ষতা শেখার অনুশীলন
কাল্পনিক বন্ধুর সঙ্গে খেলার সময় শিশুকে কখনো নিজের পাশাপাশি অন্য একটি চরিত্রের ভূমিকাও কল্পনা করতে হয়। সেই চরিত্র কী পছন্দ করে, কী বলতে পারে কিংবা কোনো ঘটনায় কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে—এসব ভাবতে গিয়ে শিশুর অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার অনুশীলন হতে পারে।
এ ছাড়া পালা করে খেলা, মতের অমিল মেটানো, সহযোগিতা করা কিংবা গল্পের মধ্যে নিয়ম তৈরির মতো বিষয়ও কাল্পনিক খেলায় উঠে আসতে পারে। তবে এসব দক্ষতা বিকাশে কাল্পনিক বন্ধুর ভূমিকা শিশুভেদে আলাদা হতে পারে।
অভিভাবকদের কী করা উচিত?
শিশু কাল্পনিক বন্ধুর কথা বললে তাকে বকাঝকা করা, উপহাস করা কিংবা জোর করে সেই বন্ধুকে ভুলে যেতে বলা ঠিক নয়। বরং সে কী নিয়ে খেলছে, বন্ধুটির গল্প কী এবং তার অনুভূতি কেমন—এসব বিষয়ে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা যেতে পারে।
শিশুকে নিজের কল্পনার জগৎ প্রকাশের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি বাস্তব জীবনের বন্ধু, পরিবারের সদস্য এবং অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ তৈরি করাও জরুরি। গল্পের বই পড়া, ছবি আঁকা, পুতুল নিয়ে খেলা এবং অভিনয়ভিত্তিক খেলাও শিশুর কল্পনাশক্তি বিকাশে সহায়ক হতে পারে।
যেসব ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন
কাল্পনিক বন্ধু তৈরি করলেই শিশুর মানসিক সমস্যা রয়েছে, এমন ধারণা ঠিক নয়। তবে শিশুর আচরণে হঠাৎ বড় পরিবর্তন দেখা দিলে, বাস্তব ও কল্পনার পার্থক্য বুঝতে সমস্যা হলে, কাল্পনিক বন্ধুর কারণে ভয় পেলে কিংবা নিজের বা অন্যের ক্ষতি করার কথা বললে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এ ছাড়া শিশুর কথা বলা, সামাজিক যোগাযোগ কিংবা দৈনন্দিন কাজকর্মে উল্লেখযোগ্য সমস্যা দেখা দিলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
শিশুর কাল্পনিক বন্ধু তার কল্পনা, গল্প বলা, আবেগ প্রকাশ ও সামাজিক অভিজ্ঞতা অনুশীলনের একটি স্বাভাবিক মাধ্যম হতে পারে। তাই এ নিয়ে অযথা ভয় না পেয়ে শিশুর কথা মন দিয়ে শোনা, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সুস্থ বিকাশে পাশে থাকাই অভিভাবকদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
সূত্র: আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস, আমেরিকান লাইব্রেরি অব মেডিসিন, চাইল্ড কেয়ার
এসি/আপ্র/২৬/১০/২০২৬