মো. জাহিদ হাসান
বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য একটি উপাদান হলো খাদ্য। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের দেশে খাদ্যে ভেজাল বাড়ছেই। ভেজালযুক্ত খাবার খেয়ে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং আয়ু কমছে। ভেজালযুক্ত অপুষ্টিকর খাবার খেয়ে মানুষের কর্মস্পৃহা ব্যাপক হারে কমে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপুষ্টির কারণে দেশের অর্থনীতিতে বছরে জিডিপির ৮ শতাংশের বেশি ক্ষতি হচ্ছে। ফলে দেশের মানবসম্পদ ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে এবং উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে।
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের সব পর্যায়ে সঠিকভাবে খাদ্যের গুণাগুণ পরীক্ষা করা। মাঠপর্যায়ে খাদ্যের গুণাগুণ নষ্ট হয় সাধারণত ফসলে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক প্রয়োগের ফলে। পোকা দমনের জন্য এবং অধিক ফসলের আশায় অধিকাংশ কৃষকরা ফসলে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সার ও কীটনাশক ছিটিয়ে থাকেন। এটি মোটেও উচিত নয়।
কৃষিবিষয়ক পরামর্শের জন্য দেশের সব উপজেলায় কৃষি কর্মকর্তা রয়েছেন। কৃষকদের উচিত, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ফসলের যত্ন নেওয়া। সাধারণত আমাদের দেশের বেশির ভাগ কৃষক অশিক্ষিত ও হতবুদ্ধি হওয়ার কারণে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে চান না। এক্ষেত্রে কৃষি কর্মকর্তাদের উদ্যোগে কৃষকদের কাছাকাছি গিয়ে কৃষিবিষয়ক সভার মাধ্যমে সচেতনতা ছড়াতে হবে। কৃষিবিষয়ক পরামর্শের জন্য অনলাইন মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও সহজ ও কার্যকরী করে তুলতে হবে। আধুনিক কৃষি পদ্ধতি সম্বন্ধে কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। মাঠ থেকে ফসল সংগ্রহ করার সময়ও অসচেতনতার কারণে খাদ্যের গুণাগুণ নষ্ট হতে পারে। কৃষকের বাড়িতে ফসল সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের পরের ধাপটি হলো পরিবহন। খাদ্য পরিবহনের সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে- খাদ্য যাতে সঠিক সময়ে সুরক্ষিতভাবে পৌঁছায়। অনেক চাষি অধিক লাভের আশায় সঠিক সময়ের চেয়ে বেশি সময় ধরে ফসল গুদামজাত করে রাখে কিংবা অনেক অসাধু ব্যবসায়ী এটি করে থাকে। এর ফলে ফসল বা খাদ্যপণ্যে পচন ধরে এবং গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়।
আমাদের দেশের অধিকাংশ চাষি ফসলের ন্যায্যমূল্য পান না। খাদ্যে ভেজালের সঙ্গে এর গূঢ় সম্পর্ক রয়েছে। সঠিক মূল্য পেলে কৃষকরা খাদ্য সংরক্ষণে আরো বেশি সতর্ক থাকবে। ফলে উৎপাদনে তাদের আগ্রহও বাড়বে। আর উৎপাদন বাড়লে বাজার চাহিদা মিটবে এবং খাদ্যে ভেজাল অনেকটাই কমে যাবে। এ জন্য সরকারি উদ্যোগে এমন বাজার ব্যবস্থা চালু করতে হবে- যেন কৃষকরা সরাসরি গ্রাহকের কাছে উপযুক্ত ফসলগুলো বিক্রি করতে পারেন। ফলে খাদ্যে ভেজাল মেশানোর সুযোগ কমে যাবে।
খাদ্যে সবচেয়ে বেশি ভেজাল করা হয় কারখানায়। বিশেষ করে খোলা খাদ্যদ্রব্যে ভেজালের মাত্রা বেশি থাকে। তবে বর্তমানে মোড়কজাত খাদ্যেও ভেজালের মাত্রা কম নয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় গোপন কারখানা রয়েছে, যেখানে অনুমোদন ছাড়াই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চলে খাদ্য প্রক্রিয়ার কাজ। এছাড়া বিভিন্ন নামিদামি কোম্পানির মোড়ক ব্যবহার করে মানহীন খাদ্যদ্রব্য বাজারজাত করা হচ্ছে- যা পুরোপুরিভাবে আইনবিরুদ্ধ কাজ।
নিরাপদ খাদ্য আমাদের নাগরিক অধিকার। তাই সরকারি উদ্যোগে যুগোপযোগী পরিকল্পনা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ নিয়ন্ত্রণের যথাযথ ব্যবস্থা করতে হবে। খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সরবরাহে পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনতে পারলে খাদ্যে ভেজাল অনেকটাই কমে যাবে। ব্যক্তি সচেতনতা ও সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় নিরবচ্ছিন্ন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/২৫.১০.২৬