শীতের শুরুতেই বাজারে দেখা মেলে নানা ধরনের শাক-সবজি। মূলা শাক, সরিষা শাক ও পালং শাকের মতো শীতকালীন সবজি স্বাদে যেমন অনন্য, তেমনি পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। এসবের মধ্যে সরিষা শাকে রয়েছে বিটা-ক্যারোটিন, ভিটামিন সি, আয়রন ও ক্যালসিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। এটি চোখ ও হাড়ের সুস্থতা বজায় রাখা, হজমের উন্নতি এবং শরীরের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে।
চলুন, জেনে নেওয়া যাক শীতকালে সরিষা শাক খাওয়ার ১০টি সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারিতা।
১. শরীরের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে
ক্ষত বা সংক্রমণ থেকে শরীরের টিস্যুকে রক্ষা করতে প্রদাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ হৃদ্রোগ, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার সমস্যা ও কয়েক ধরনের ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত। সরিষা শাকে থাকা কিছু উপাদান দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে।
২. অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কোষের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে
শরীরের বিপাকপ্রক্রিয়া, বায়ুদূষণ ও সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে তৈরি মুক্ত মৌল কোষের ক্ষতি করতে পারে। এ ধরনের ক্ষতির সঙ্গে হৃদ্রোগ ও ক্যানসারের সম্পর্ক রয়েছে। সরিষা শাকে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কোষের ক্ষতি কমাতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে কচি সরিষা শাকে এসব উপকারী উপাদান থাকতে পারে।
৩. চোখের সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে
চোখের রেটিনাকে আক্রান্ত করে এমন একটি সমস্যা হলো ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, যা কেন্দ্রীয় দৃষ্টিশক্তি কমিয়ে দিতে পারে। চোখের সুস্থতার জন্য লুটিন ও ভিটামিন এ গুরুত্বপূর্ণ। সরিষা শাকে এই দুই পুষ্টি উপাদান রয়েছে। বিশেষ করে কচি সরিষা শাকে এগুলোর পরিমাণ বেশি থাকতে পারে।
৪. রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে
সরিষা শাকে রয়েছে ভিটামিন সি, যা শরীরের বৃদ্ধি, বিকাশ ও ক্ষত সারাতে সাহায্য করে। এ ছাড়া এটি কোলাজেন তৈরিতে ভূমিকা রাখে। কোলাজেন ত্বক ও শরীরের অন্যান্য টিস্যুর গঠন ঠিক রাখতে সহায়তা করে। ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ।
৫. হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখে
হাড়ের গঠন ও শক্তি বজায় রাখতে ভিটামিন কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি হাড় ভাঙা ও অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে। কাঁচা সরিষা শাকে প্রচুর ভিটামিন কে থাকে। প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী, দুই কাপ কাঁচা সরিষা শাকে প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক চাহিদার দ্বিগুণেরও বেশি ভিটামিন কে থাকতে পারে। তাই এই শাক ভিটামিন কে-এর ভালো উৎস।
৬. ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে
সরিষা শাকে গ্লুকোসিনোলেট নামের একধরনের যৌগ রয়েছে। এটি শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ নিষ্কাশন, কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা ও প্রদাহ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এসব যৌগ অস্বাভাবিক কোষ অপসারণে সহায়তা করতে পারে। এ কারণে কোলন ও থাইরয়েডের ক্যানসার প্রতিরোধে সরিষা শাকের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে সরিষা শাক খাওয়াই ক্যানসার প্রতিরোধের নিশ্চয়তা দেয় না।
৭. হজমের উন্নতি ঘটায়
সরিষা শাকে থাকা খাদ্যআঁশ মলের পরিমাণ বাড়ায় এবং নিয়মিত মলত্যাগে সহায়তা করে। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝুঁকি কমতে পারে। এর কিছু পুষ্টি উপাদান অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সুস্থতা বজায় রাখতেও সাহায্য করে।
এ ছাড়া সরিষা শাক পিত্ত অ্যাসিডের পুনরায় শোষণ কমিয়ে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। এতে নতুন পিত্ত অ্যাসিড তৈরির জন্য শরীরকে বেশি কোলেস্টেরল ব্যবহার করতে হয়।
৮. অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কম থাকার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে
সরিষা শাকের মতো ক্রুসিফেরাস গোত্রের সবজিতে থাকা আইসোথায়োসায়ানেট ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সহায়তা করতে পারে। কিছু গবেষণায় এ ধরনের সবজি বেশি খাওয়ার সঙ্গে হৃদ্রোগ ও ক্যানসারে মৃত্যুর ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এ ধরনের সম্পর্ক থেকেই সরাসরি বলা যায় না যে সরিষা শাক খেলেই অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কমবে।
৯. কিছু ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে
পরীক্ষাগারে চালানো গবেষণায় দেখা গেছে, সরিষা শাক ই. কোলাই ও ব্যাসিলাস সাবটিলিস নামের দুটি ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি প্রতিরোধ করতে পারে। পূর্ণবয়স্ক সরিষা শাকের তুলনায় কচি শাকে এ ধরনের প্রভাব বেশি দেখা গেছে। তবে পরীক্ষাগারের ফলাফল থেকে মানুষের শরীরে একই ধরনের প্রভাব নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়া যায় না।
১০. স্বাভাবিক পরিমাণে খেলে থাইরয়েড নিয়ে উদ্বেগের কারণ সাধারণত কম
থাইরয়েড গ্রন্থি হরমোন তৈরির জন্য আয়োডিন ব্যবহার করে। সরিষা শাকে থাকা গয়ট্রোজেন নামের উপাদান আয়োডিনের কার্যক্রমে বাধা দিতে পারে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাভাবিক পরিমাণে সরিষা শাকের মতো ক্রুসিফেরাস গোত্রের সবজি খেলে সাধারণত থাইরয়েডের কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য সমস্যা হয় না।
তবে যাঁদের থাইরয়েডের সমস্যা রয়েছে বা যাঁদের খাদ্যাভ্যাসে বিশেষ বিধিনিষেধ আছে, তাঁদের চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার নির্বাচন করা ভালো।
সূত্র: ভেরিওয়েল হেলথ
এসি/আপ্র/২৬/১০/২০২৬