গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

ডিগ্রিধারী বৃদ্ধিতেও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারী কম

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:১৫ পিএম, ২১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২১:০৯ এএম ২০২৬
ডিগ্রিধারী বৃদ্ধিতেও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারী কম
ছবি

ছবি সংগৃহীত

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সাম্প্রতিক ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬’ বাংলাদেশের উন্নয়ন ও নারী অধিকারের প্রগতির মুখের ওপর এক বিশাল আয়না ধরেছে। ওই আয়নায় যে ছবি ভেসে উঠেছে, তা আনন্দের নয়; বরং সংকোচ ও উদ্বেগের। এক বছর আগেই অর্থাৎ ২০২৫ সালে বৈশ্বিক লিঙ্গ সমতা সূচকে ২৪তম স্থানে থাকা বাংলাদেশ ২০২৬ সালে একলাফে ৫৫ ধাপ নিচে নেমে পৌঁছেছে ৭৯তম অবস্থানে। বিশ্বমঞ্চে লিঙ্গ সমতার সূচকে এটিই এবার যে কোনো দেশের জন্য সবচেয়ে বড় ও খাড়া পতন।

যে চার ক্ষেত্র অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন; এর ওপর ভিত্তি করে ওই সূচক তৈরি হয়। এর মধ্যে প্রধান দুটি স্তম্ভে ধস নামার কারণেই ঘটেছে এই বিপজ্জনক বিপর্যয়। প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, বাংলাদেশ নারীর উন্নয়নকে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক কাগজেই সীমাবদ্ধ রেখেছে, নাকি সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর গোড়ায় গলদ রয়ে গেছে?

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদনে যে বিশাল ধসের কথা বলা হয়েছে, এর অন্যতম মূল অনুঘটক হলো ‘রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন’ (পলিটিক্যাল এমপাওয়ারমেন্ট) খাতে সূচকের করুণ অবস্থা। সংসদ বিলুপ্তির পর গঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল এই চিত্রকে নগ্ন সত্য হিসেবে তুলে ধরেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ নির্বাচনে মাত্র ৮৪ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, যা মোট প্রার্থীর হিসাব করলে সামান্য, ৪ দশমিক ০৮ শতাংশ। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ৩০০টি সাধারণ আসনের মধ্যে সরাসরি নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসতে পেরেছেন মাত্র ৭ জন নারী। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোতে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্বের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত থাকলেও বাস্তব চিত্র বলছে, বর্তমানে সেখানে নারীর উপস্থিতি নামমাত্র ২ দশমিক ৩ থেকে ২ দশমিক ৪ শতাংশে ঝুলছে। ফলে বর্তমান সংসদে মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ আসনে নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন- যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।

বাংলাদেশের ২০২৬ সালের সবচেয়ে ভঙ্গুর ক্ষেত্রটি হলো ‘অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ’ (ইকোনমিক পার্টিসিপেশন অ্যান্ড অপরচুনিটি)। ডব্লিউইএফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্যের মাত্র ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ দূর করতে পেরেছে অর্থাৎ বাকি ৫৮ দশমিক ১ শতাংশ বৈষম্য আজও বিদ্যমান। শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শতভাগ অর্জনের পথে অনেকদূর হেঁটেছে; মাধ্যমিক ও প্রাথমিকে মেয়েদের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। তবে এই শিক্ষাগত অর্জনের সঙ্গে বাস্তব অর্থনীতি বা জীবনের কোনও সুষম সেতু তৈরি হয়নি। উচ্চশিক্ষিত নারীদের মাত্র ৫ শতাংশ কর্মজীবী। একে বলা যায় ‘শিক্ষাগত অর্জন বনাম রূপান্তরের সংকট’। মেয়েদের ডিগ্রি বাড়ছে। কিন্তু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে তার প্রতিফলন ঘটছে না। এর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ গৃহে নারীর অপরিশোধিত সেবামূলক কাজের (আনপেইড কেয়ার ওয়ার্ক) বোঝা। বাংলাদেশে একজন নারী প্রতিদিন ঘরের রান্নাবান্না, সন্তান লালন-পালন ও অন্যান্য কাজে গড়ে ৬ দশমিক ২ ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন; যেখানে একই পরিবারে পুরুষরা ব্যয় করেন মাত্র ১ দশমিক ৪ ঘণ্টা। এই চরম অসম গৃহস্থালি কাজের বোঝা এবং শ্রমবাজারে পুরুষের তুলনায় গড়ে ২২ থেকে ২৫ শতাংশ কম মজুরি পাওয়ায় নারীকে ঘরের বাইরে পূর্ণকালীন বা স্বাধীন পেশাগত ক্যারিয়ার গঠনে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথকে রুদ্ধ করতে আরও একটি অদৃশ্য অথচ প্রত্যক্ষ দেয়াল হিসেবে কাজ করছে ঢাকার গণপরিবহন ও সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী ঢাকার গণপরিবহন ব্যবহারকারী প্রায় ৭৯ শতাংশ নারী কোনও না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হন; এমনকি প্রতি ৬ জন নারীর একজন প্রতিদিন এ ধরনের কটু মন্তব্য, স্পর্শ বা যৌন হয়রানির মুখোমুখি হন। নিরাপত্তার এই সার্বক্ষণিক ভয় নারীদের ভৌগোলিক ও পেশাগত গতিশীলতাকে বন্দি করে ফেলে।

বাংলাদেশের নারী অধিকারের এই খাড়া নিম্নমুখী যাত্রার নেপথ্যে দুটি প্রধান সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ঘাতক কলকাঠি নাড়ছে; একদিকে গভীর পিতৃতান্ত্রিকতার মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ, অন্যদিকে উগ্র মৌলবাদী অপপ্রচার এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। আমাদের সমাজব্যবস্থা এমনভাবে পিতৃতান্ত্রিকতার বিষবৃক্ষ রোপণ করেছে, যা নারীকে স্বাধীন সত্তার বদলে কেবল পুরুষের অধীনস্থ হিসেবে দেখতেই অভ্যস্ত। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, কেবল পুরুষরা নন, পিতৃতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে অনেক নারীও অবচেতনভাবে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করছেন। শৈশব থেকেই কন্যাসন্তানকে ‘পরের আমানত’ কিংবা ‘পারিবারিক সম্মানের প্রতীক’ বানিয়ে গৃহবন্দি মানসিকতায় বড় করার মাধ্যমে নারীরা নিজেরাই পিতৃতন্ত্রের নীরব বাহক হয়ে উঠছেন- যা তাদের আত্মমর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়। নির্বাচন বা জাতীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় এলেই এই কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলো নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সরব হয়।

প্রগতিশীল যেকোনও জাতীয় নারী নীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেই এরা ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে তার বিরুদ্ধে উগ্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কখনও নারীদের কাজের কর্মঘণ্টা কমিয়ে বা তাদের নির্দিষ্ট গৃহস্থালি গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখার প্রস্তাব দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার পাঁয়তারা চালায়, আবার কখনও নারীকে ‘অন্তপুরচারিণী’ বানিয়ে মধ্যযুগীয় দাসত্বের সংস্কৃতির দিকে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা চালায়। তাছাড়া ইন্টারনেট বা গণপরিসরে কোনও নারী সোচ্চার হলে কিংবা রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে চাইলে তাকে সাইবার বুলিং, সংগঠিত ট্রলিং ও চরিত্রহননের (ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন) শিকার বানিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়া হয়। ফলে এই সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দুই ঘাতকের যৌথ চাপে বাংলাদেশে নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথ আজ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত।

মেয়েদের কেবল বিদ্যালয়ে পাঠানোই শেষ কথা নয়, শিক্ষা শেষে যেন তারা নিরাপদ কর্মপরিবেশ, গণপরিবহন, সমমজুরি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক টেবিলে নিজেদের স্থান তৈরি করতে পারেন, তা রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে। রাজনীতির ময়দানে নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক এবং কার্যকর সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। উগ্র মৌলবাদী অপপ্রচার ও পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক প্রথাকে আইন ও সচেতনতার মাধ্যমে কঠোরভাবে দমন করতে হবে। বাংলাদেশ যদি সত্যিই তার কাঙ্ক্ষিত উন্নত, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রের রূপ দেখতে চায়, তবে নারীকে ঘরের কোণে বন্দি রাখার মানসিকতা থেকে বের হয়ে এসে তাদের সম-অধিকার ও পূর্ণ ক্ষমতায়ন সুনিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

কেএমএএ/আপ্র/২১.১০.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

শিশুদের নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
২১ অক্টোবর ২০২৬

শিশুদের নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব

আজকের শিশুই আগামীর দেশ ও জাতির প্রকৃত সম্পদ। তারাই মূলত দেশ ও জাতি গঠনের কারিগর। একটি শিশুর জন্মের স...

নারীসত্তার পবিত্রতা ও সৃষ্টির শক্তি উপলব্ধির সাধনাই কুমারীপূজা
২১ অক্টোবর ২০২৬

নারীসত্তার পবিত্রতা ও সৃষ্টির শক্তি উপলব্ধির সাধনাই কুমারীপূজা

মাতৃভাব মানবহৃদয়ের অন্যতম পবিত্র অনুভূতি। এই ভাবের মধ্যেই নিহিত রয়েছে স্নেহ, মমতা, শ্রদ্ধা ও শুদ্ধতা...

মা-সন্তানদের আহার সংস্থানে প্রতিবন্ধী রাশিদার সংগ্রাম
২১ অক্টোবর ২০২৬

মা-সন্তানদের আহার সংস্থানে প্রতিবন্ধী রাশিদার সংগ্রাম

ঈশ্বরদীর সাঁড়া গোপালপুর বিলপাড়া গ্রামের রাশিদা খাতুন। বয়স এখন ৪৫ ছুঁই ছুঁই। মাত্র ৮ বছর বয়সে গাছ থেক...

দুর্গাপূজার আয়োজক ১১ বছর ধরে একদল নারী উদ্যোক্তা
২১ অক্টোবর ২০২৬

দুর্গাপূজার আয়োজক ১১ বছর ধরে একদল নারী উদ্যোক্তা

চাঁদা সংগ্রহ থেকে বাজার করা, মণ্ডপ সাজানো থেকে শুরু করে পূজার সার্বিক ব্যবস্থাপনা- সবই করেন নিজেরা।...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই